ভূমিকা: এক নির্জন দুপুরের ভাবনা
মাঝে মাঝে খুব নির্জন দুপুরে বারান্দায় বসে যখন আমি বাইরের জগৎটা দেখি, তখন একটা অদ্ভুত বিষণ্ণতা আমাকে ঘিরে ধরে। চারদিকে ধূসর রঙের দালানকোঠা, পিচঢালা কালো রাস্তা আর যান্ত্রিক সব শব্দ। আমরা মানুষরা হয়তো ভুলেই গিয়েছি যে আমাদের প্রাণের স্পন্দন আসলে এই কংক্রিটের ভাঁজে নেই, তা লুকিয়ে আছে ওই সবুজ পাতায় কিংবা প্রবাহমান স্বচ্ছ জলে।
রাসূল (সা.) মুমিনের উদাহরণ দিতে গিয়ে একটি কচি চারাগাছের কথা বলেছিলেন। তিনি বলতেন, মুমিন হলো সেই সতেজ উদ্ভিদের মতো যাকে বাতাস কখনো হেলিয়ে দেয়, আবার বাতাস থেমে গেলে সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।
প্রকৃতির সাথে আমাদের এই যে নিবিড় মিল, এটি কি আমরা ইদানীং খুব বেশি অগ্রাহ্য করছি না? আমাদের চারপাশের এই মহাজগৎ যে কেবল ব্যবহারের বস্তু নয়, বরং এর সাথে আমাদের একটি গভীর আত্মার সম্পর্ক আছে, সেই মায়ার জগৎটি আজ খুব অস্পষ্ট হয়ে গেছে।
জড়বস্তুরও যখন প্রাণ থাকে
আমরা যখন এক গ্লাস পানি পান করি বা একটি সুন্দর মসৃণ পাথর হাতে নিই, তখন আমরা সেগুলোকে স্রেফ ‘রিসোর্স’ বা প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে দেখি। কিন্তু কুরআন আমাদের এক ভিন্ন এবং বিস্ময়কর দৃষ্টিভঙ্গি শেখায়।
ইসলাম অনুযায়ী পানি, গাছ কিংবা নিথর পাথরও আল্লাহর একেকটি ‘মাখলুক’ বা সৃষ্টি। এই পুরো প্রাকৃতিক জগৎটি সহজাতভাবেই স্রষ্টার নিয়মের কাছে সম্পূর্ণ সমর্পিত। যখন আমরা একটি পাথরকে সম্মানের চোখে দেখি, তখন আসলে আমরা স্রষ্টার সেই নিপুণ কারুকার্যকেই সম্মান জানাই।
প্রকৃতি আমাদের জন্য কেবল ভোগের সামগ্রী নয়, বরং প্রতিটি জড় ও জীবন্ত উপাদান স্রষ্টার একেকটি নিদর্শন। এই বোধটি আমাদের শেখায় যে স্রষ্টার সাথে সম্পর্কের খাতিরে আমাদের চারপাশের পরিবেশের প্রতিও মায়া থাকা প্রয়োজন।
কিয়ামত শুরুর ঠিক আগের সেই চারাগাছটি
ভেবে দেখুন তো, পৃথিবী তার শেষ মুহূর্তে এসে দাঁড়িয়েছে। চারদিকে চরম বিশৃঙ্খলা, কিয়ামত শুরু হয়ে যাচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে আপনার হাতে একটি ছোট চারাগাছ। আপনি কি সেটি ফেলে দেবেন?
রাসূল (সা.) আমাদের এক চরম আশাবাদের শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কিয়ামত শুরু হওয়ার আগ মুহূর্তেও যদি কারও হাতে একটি চারাগাছ থাকে, তবে যেন সে সেটি রোপণ করে দেয়। হাদিসটি এমন —
إِذَا قَامَتِ السَّاعَةُ وَفِي يَدِ أَحَدِكُمْ فَسِيلَةٌ فَلْيَغْرِسْهَا
“যদি কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় উপস্থিত হয় এবং তোমাদের কারও হাতে একটি ছোট চারাগাছ থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ করে দেয়।”
এই হাদিসটি আমাদের শেখায় যে, প্রকৃতির যত্ন নেওয়া কেবল পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়, এটি একটি চিরন্তন ইবাদত। ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়েও জীবনের বীজ বপন করার এই দর্শন আমাদের পরিবেশ রক্ষার প্রতি অসীম এক মমতা আর আশাবাদ শেখায়।
প্রবাহমান নদী এবং মিতব্যয়ী জীবনের গল্প
পানির অপচয় নিয়ে আমরা প্রায়ই দুশ্চিন্তা করি, কিন্তু এর পেছনে যে কী অসাধারণ এক জীবনদর্শন আছে, তা রাসূল (সা.)-এর একটি ছোট ঘটনা থেকে বোঝা যায়।
একদিন সা’দ (রা.) ওজু করছিলেন এবং প্রয়োজনে কিছুটা বেশি পানি ব্যবহার করছিলেন। রাসূল (সা.) তাকে দেখে অপচয় করতে নিষেধ করলেন। অবাক হয়ে সা’দ (রা.) জিজ্ঞেস করলেন যে, ওজুর মতো পবিত্র কাজেও কি অপচয় হয়? তখন রাসূল (সা.) বললেন, হ্যাঁ, এমনকি তুমি যদি প্রবাহমান কোনো নদীর তীরে বসেও ওজু করো, সেখানেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করা অপচয়।
এটি কেবল পানি সাশ্রয়ের শিক্ষা নয়, বরং প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। রাসূল (সা.) নিজে খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন। তিনি নিজের জুতো নিজে মেরামত করতেন, নিজের কাপড় সেলাই করতেন। এই যে অপ্রয়োজনীয় জিনিসের মোহ ত্যাগ করা এবং যা আছে তাকেই সারিয়ে ব্যবহার করা, এটাই ছিল তাঁর কাছে প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে চলার শিক্ষা।
পুরো পৃথিবীটাই যখন একটি মসজিদ
আমাদের অনেকের ধারণা, কেবল মসজিদের চার দেয়ালের ভেতরেই সব পবিত্রতা সীমাবদ্ধ। কিন্তু রাসূল (সা.)-এর শিক্ষা অনুযায়ী পুরো পৃথিবীটাই সিজদা করার জায়গা বা মসজিদ। এর প্রতিটি ইঞ্চি পবিত্র।
যখন আমরা রাস্তা থেকে একটি ক্ষতিকর বস্তু বা কাঁটা সরিয়ে দিই, তখন সেটি কেবল নাগরিক দায়িত্ব নয়, বরং একটি বড় মাপের সদকা এবং ইবাদত।
রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়াও একটি সদকা।
প্রকৃতিকে পরিচ্ছন্ন রাখা আসলে স্রষ্টার তৈরি এই বিশাল ইবাদতগাহকে পরিষ্কার রাখারই নামান্তর। আমাদের চারপাশের রাস্তা, বনভূমি কিংবা সমুদ্রসৈকত অপবিত্র করা তাই স্রেফ পরিবেশদূষণ নয়, বরং ইবাদতগাহের পবিত্রতা নষ্ট করার মতো একটি কাজ।
একটি ভারসাম্য বা মীজানের গল্প
কুরআন আমাদের ‘মীজান’ বা ভারসাম্যের কথা বলে। আকাশমণ্ডল ও পৃথিবী এক নিখুঁত গাণিতিক ভারসাম্যে টিকে আছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন —
وَالسَّمَاءَ رَفَعَهَا وَوَضَعَ الْمِيزَانَ
“তিনি আকাশকে করেছেন সমুন্নত এবং স্থাপন করেছেন ভারসাম্য।”
মানুষ হিসেবে আমরা এই পৃথিবীর মালিক নই, বরং আমরা হলাম ‘খলিফা’ বা বিশ্বস্ত আমানতদার। এই আমানত রক্ষা করা মোটেও সহজ কোনো কাজ নয়। পবিত্র কুরআনের বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, এই আমানত বা দায়িত্বের ভার আকাশমণ্ডল এবং পাহাড়কে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা ভয়ে তা গ্রহণ করতে রাজি হয়নি। শেষ পর্যন্ত মানুষ এই গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।
আমরা যখন পাহাড় কাটি, বন উজাড় করি কিংবা নদী দূষিত করি, তখন আসলে আমরা সেই ঐশ্বরিক ভারসাম্য বা মীজান নষ্ট করে ফেলি। আমানতদার হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো পৃথিবীকে ঠিক সেভাবেই রক্ষা করা, যেভাবে স্রষ্টা আমাদের কাছে সোপর্দ করেছেন।
পরিবেশ যখন বিচারের দিনে সাক্ষী হবে
আমাদের প্রতিটি কাজের জন্য পরকালে জবাবদিহি করতে হবে। এমনকি প্রকৃতির ওপর আমাদের আচরণও বিচারের আওতায় আসবে। কুরআনের ভাষায় পরিবেশের ক্ষতি করাকে বলা হয়েছে ‘ফাসাদ’ বা বিপর্যয়।
অকারণে একটি চড়ুই পাখিকে মারলেও বিচারের দিনে সেই ক্ষুদ্র পাখিটি আল্লাহর কাছে নালিশ জানাবে। সে বলবে যে, হে আল্লাহ, এই ব্যক্তি আমাকে কোনো প্রয়োজনে নয় বরং স্রেফ মজার ছলে বা শখের বশে হত্যা করেছিল।
খাদ্যের প্রয়োজন ছাড়া কেবল আনন্দের জন্য কোনো প্রাণ হরণ করা বা উদ্ভিদ ধ্বংস করা ইসলামে কঠিনভাবে নিষিদ্ধ। প্রকৃতির প্রতিটি ক্ষুদ্র প্রাণ ও উদ্ভিদ আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হতে পারে, যদি আমরা তাদের সাথে অবিচার করি।
উপসংহার: আমাদের শেষ চিন্তা
এতক্ষণ যা আলাপ করলাম, তার সারমর্ম খুব সহজ। আমরা এই পৃথিবীর অধিপতি নই, বরং এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের চারপাশের এই গাছপালা, নদী আর পাহাড় আমাদের বন্ধু।
আমাদের আধুনিক জীবন হয়তো আমাদের অনেক দূরে নিয়ে এসেছে, যান্ত্রিকতার ভিড়ে আমরা সেই পুরোনো টান অনুভব করতে পারছি না। দিনশেষে একটি গভীর প্রশ্ন আমার মনে সবসময় উঁকি দেয়, যা আপনাদের কাছেও রেখে যেতে চাই।
আমরা কি আমাদের চারপাশের এই জীবন্ত আর মায়াবী পৃথিবীর সাথে আবার সেই পুরোনো বন্ধুত্বটা ফিরিয়ে আনতে পারি না?





