প্রবন্ধ

All right reserved by the author & the respective writers

3 মিনিট পড়ার সময়

আখেরী চাহার শোম্বা: এক টুকরো অলৌকিক সকালের গল্প

মানুষের জীবনে হুট করে আসা অসুস্থতা যেমন মনকে বিষণ্ণতায় ডুবিয়ে দেয়, তেমনি অনেক কষ্টের পর সুস্থ হয়ে ওঠার প্রথম সকালটি মনে হয় এক টুকরো স্বর্গীয় আলো। রোগমুক্তির সেই আনন্দ কেবল শরীরের নয়, মনেরও।

ইসলামের কন্ঠ
আখেরী চাহার শোম্বা: এক টুকরো অলৌকিক সকালের গল্প

মানুষের জীবনে হুট করে আসা অসুস্থতা যেমন মনকে বিষণ্ণতায় ডুবিয়ে দেয়, তেমনি অনেক কষ্টের পর সুস্থ হয়ে ওঠার প্রথম সকালটি মনে হয় এক টুকরো স্বর্গীয় আলো। রোগমুক্তির সেই আনন্দ কেবল শরীরের নয়, মনেরও। আখেরী চাহার শোম্বা কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, বরং এটি বিশ্বাসের এক গভীর জায়গা যেখানে লুকিয়ে আছে আনন্দ আর বিরহের এক মায়াময় ইতিহাস।

নামের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস

এই দিনটির নাম শুনলেই বোঝা যায় এটি কোনো একটি নির্দিষ্ট ভাষার শব্দ নয়। 'আখেরী চাহার শোম্বা' হলো আরবী এবং ফার্সি শব্দের এক অদ্ভুত ও চমৎকার মিলন। আরবী শব্দ 'আখেরী' যার অর্থ হলো শেষ, এবং ফার্সি শব্দ 'চাহার শোম্বা' যার অর্থ হলো বুধবার। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, হিজরি ক্যালেন্ডারের সফর মাসের শেষ বুধবারকেই ইতিহাসের পাতায় এই নামে চেনা হয়।

সেই অলৌকিক বুধবারের স্মৃতি

দশম হিজরীর সফর মাস। ইসলামের ইতিহাসে এই সময়টি ছিল অত্যন্ত আবেগপ্রবণ এবং থমথমে। রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন গুরুতর অসুস্থ। তাঁর শারীরিক অবস্থা এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে, তিনি মসজিদের জামাতে নামাজের ইমামতি পর্যন্ত করতে পারছিলেন না। মদিনার অলিতে-গলিতে সাহাবীদের মনে তখন দুশ্চিন্তার কালো মেঘ। কিন্তু ২৮ সফর, অর্থাৎ সেই বুধবারের সকালে হঠাৎ যেন মেঘ কেটে রোদ উঠল।

প্রিয় নবীজি (সা.) সেদিন কিছুটা সুস্থবোধ করলেন। তিনি হযরত আয়েশা (রা.) কে ডেকে বললেন, আমার জ্বর কিছুটা কমেছে, আমাকে গোসল করিয়ে দাও। সেই সকালে তিনি গোসল করলেন এবং মাথায় পট্টি বাঁধলেন। এরপর তিনি শেষবারের মতো নামাজের ইমামতি করলেন। ঘরোয়া পরিবেশে এক টুকরো আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল। তিনি তাঁর দুই আদরের নাতি ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইনকে নিয়ে সকালের নাস্তা করলেন। মদিনার ঘরে ঘরে সেই খুশির খবর বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়ল। শোকাতুর মদিনা যেন মুহূর্তেই হাসিতে ভরে উঠল।

আখেরী চাহার শোম্বার এই গোসলটি ছিল প্রিয় নবীজি (সা.) এর জীবনের শেষ স্বাভাবিক গোসল, যার পরবর্তী গোসলটি ছিল তাঁর জানাজার গোসল। এই একটি সাধারণ তথ্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সেই দিনের গভীর তাৎপর্য এবং পরবর্তী বিরহের পূর্বাভাস।

সাহাবীদের বাঁধভাঙ্গা আনন্দ ও দানশীলতার মহোৎসব

নবীজীর সুস্থতার খবর শুনে সাহাবীদের মধ্যে যে আনন্দের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। প্রিয় মানুষটির একটু সুস্থতার জন্য তারা তাদের সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ বিলিয়ে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি। যেন একেকজন সাহাবী একেকটি নক্ষত্র হয়ে পৃথিবীতে মমতা ছড়াচ্ছেন। সেদিন সাহাবীদের দানের পরিমাণগুলো ছিল বিস্ময়কর:

  • হযরত আবু বকর (রা.) পাঁচ হাজার দিরহাম অসহায় মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিলেন।
  • হযরত ওমর (রা.) দান করলেন সাত হাজার দিরহাম।
  • হযরত ওসমান (রা.) দান করলেন দশ হাজার দিরহাম।
  • হযরত আলী (রা.) দান করলেন তিন হাজার দিরহাম।
  • সবচেয়ে বেশি দান করলেন হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.)। তিনি আল্লাহর রাস্তায় একশত উট বিলিয়ে দিলেন।

সাহাবীদের এই ভালোবাসা আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভালোবাসার কাছে জাগতিক সম্পদের মূল্য আসলে কতটা তুচ্ছ।

আমল ও বিশ্বাসের রূপরেখা

অনেকেই এই দিনটিকে 'শুকরিয়া দিবস' হিসেবে পালন করেন। বুজুর্গানে দ্বীনরা এই দিনে গোসল করা এবং দুই রাকাত শুকরানা নফল নামাজ আদায় করার পরামর্শ দিয়েছেন। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, এই নামাজে প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর ১১ বার সূরা ইখলাস পাঠ করা হয় এবং নামাজ শেষে ৭০ বার ইস্তেগফার পড়ার রেওয়াজ আছে।

একটি বিশেষ আমলের কথা ফাযায়েলের কিতাবগুলোতে পাওয়া যায়। পবিত্র কুরআনের শেফা সম্বলিত ৬টি আয়াত এবং 'সাত সালাম' সম্বলিত আয়াতগুলো চিনির প্লেটে বা কলা পাতায় লিখে তা ধুয়ে পানি পান করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এতে কঠিন রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। তবে সবক্ষেত্রেই মনে রাখা দরকার যে, ধর্ম পালনে বাড়াবাড়ি বা কুসংস্কার এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। নদীতে দলবেঁধে গোসল করা বা কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যার আমল নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কোনো শক্তিশালী সহিহ ভিত্তি নেই। সাধারণ ইবাদত আর দোয়াতেই স্রষ্টার সন্তুষ্টি নিহিত।

একটি বিতর্ক এবং ইতিহাসের ভিন্ন পিঠ

আখেরী চাহার শোম্বা পালন নিয়ে আলেম সমাজের মধ্যে কিছুটা মতভেদ আছে। একদল আলেম একে 'বিদআত' হিসেবে গণ্য করেন। তাঁদের মতে, সাহাবীদের যুগে এই দিবসটি পালন করার প্রথাগত কোনো অস্তিত্ব ছিল না। অন্যদিকে, অন্য একদল আলেম ও গবেষক একে 'ইয়াওমিল্লাহ' বা 'আল্লাহর স্মরণীয় দিবস' হিসেবে দেখেন। তাঁরা মনে করেন, নবীজীর স্মৃতিবিজড়িত একটি দিনকে স্মরণ করা এবং সেই উপলক্ষে ইবাদত বা দান-সদকা করা কোনোভাবেই দোষের হতে পারে না। সত্য আসলে কোথায়, সেই বিচার পাঠকদের চিন্তার ওপর ছেড়ে দেওয়াই ভালো। তবে নবী-অলিদের স্মৃতি যে মুমিন হৃদয়ে নতুন করে ঈমানী শক্তি জোগায়, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

উপসংহার: বিষাদ ও আনন্দের সন্ধিক্ষণ

সফরের সেই শেষ বুধবারটি ছিল এক অদ্ভুত দ্বৈত রূপের অধিকারী। সকালটি শুরু হয়েছিল সুস্থতার অপরিসীম আনন্দ দিয়ে, অথচ বিকেল হতেই প্রিয় নবীজি (সা.) পুনরায় অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সেই অসুস্থতার রেশ ধরেই মাত্র ১২ দিন পর তিনি এই নশ্বর পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন। আমাদের জীবনও বোধহয় এমন। যেখানে সকালে সূর্যের আলো থাকে, সেখানে বিকেলেই হয়তো অন্ধকারের ছায়া হানা দিতে পারে। আখেরী চাহার শোম্বা আমাদের শিখিয়ে দিয়ে যায়, সুস্থতা আল্লাহর এক বিশাল নেয়ামত। এক চিলতে হাসির পর দীর্ঘ বিরহের যে গল্প এই দিনটি আমাদের শোনায়, তা কি আমাদের জীবনের নশ্বরতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে না? সুস্থতার কদর করা এবং স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকাটাই হোক এই দিনের মূল শিক্ষা।

শেয়ার করুন