প্রবন্ধ

All right reserved by the author & the respective writers

5 মিনিট পড়ার সময়

মক্কার সেই ধূলিকণা থেকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)

একবার চোখ বন্ধ করে কল্পনা করো তো। চারিদিকে ধূ ধূ মরুভূমি। মাথার ওপর তপ্ত সূর্য। সময়টা আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগের কথা। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দ (প্রসিদ্ধ মত)। সেই বছর মক্কায় এক অদ্ভুত কাণ্ড হয়েছিল।

মোহাম্মদ আব্দুল আজিম
মক্কার সেই ধূলিকণা থেকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)

একবার চোখ বন্ধ করে কল্পনা করো তো। চারিদিকে ধূ ধূ মরুভূমি। মাথার ওপর তপ্ত সূর্য। সময়টা আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগের কথা। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দ (প্রসিদ্ধ মত)। সেই বছর মক্কায় এক অদ্ভুত কাণ্ড হয়েছিল। আবরাহা নামের এক রাজা বিশাল হাতি নিয়ে মক্কা আক্রমণ করতে এসেছিলেন। তাই সেই বছরকে বলা হয় হস্তী যুদ্ধের বছর। ঠিক সেই বছরেই মক্কার এক কুঁড়েঘরে জন্ম নিলেন এক ইয়াতিম শিশু। কী মায়াবী তাঁর মুখ! জানো তো, জন্মের আগেই তিনি তাঁর বাবা আব্দুল্লাহকে হারিয়েছিলেন। আজ আমরা সেই ছোট্ট শিশুটির বড় হয়ে ওঠার গল্প শুনব। আমাদের অতি চেনা এক অসাধারণ মানুষের অজানা সব গল্পের কথা জানব।

১. মরুভূমির ইয়াতিম শিশু (শৈশব ও বংশপরিচয়)
আমাদের প্রিয়নবী (সা.) এর বাবার নাম ছিল আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব। আর মা ছিলেন বনু যুহরা গোত্রের আমেনা বিনতে ওহাব। শিশুটির জন্মের পর খুশিতে আত্মহারা হয়ে দাদা আব্দুল মুত্তালিব তাঁর নাম রাখলেন 'মুহাম্মাদ'। এর অর্থ হলো -যাঁর প্রশংসা করা হয়।
শৈশবে তাঁকে দেখাশোনা করেছেন সুওয়াইবা আর হালিমাতুস সাদিয়া। জানো, হালিমা যখন তাঁকে লালন-পালন করতেন, তখন তাঁর সাথে খেলত দুধ-ভাই আব্দুল্লাহ আর বোন শাইমা। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, শিশু মুহাম্মাদ (সা.) এর বয়স যখন মাত্র ছয় বছর পার হয়ে সাত বছরে পড়ছে, তখনই তাঁর মা আমেনা মারা যান। কী ভীষণ একা হয়ে পড়লেন তিনি, তাই না? তবে আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তার ভয় কীসের? মা মারা যাওয়ার পর তাঁকে আগলে রাখলেন উম্মে আইমান। নবীজি (সা.) বড় হয়ে এই উম্মে আইমানকে ডাকতেন 'মায়ের পর মা' বলে। এরপর দাদা আব্দুল মুত্তালিব আর দাদা মারা যাওয়ার পর চাচা আবু তালিব তাঁকে নিজের ছেলের মতো বড় করলেন।

২. পাহাড়ের চূড়ায় আসা সেই প্রথম আলো (নবুয়্যত ও ওহী)
মুহাম্মাদ (সা.) বড় হওয়ার সাথে সাথে মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখে খুব কষ্ট পেতেন। তিনি একা থাকতে ভালোবাসতেন। মক্কার হেরা গুহায় তিনি দিনের পর দিন ধ্যান করতেন। একদিন সেই গুহায় জিবরাইল (আ.) এলেন আল্লাহর বাণী নিয়ে। নবীজি (সা.)-এর বয়স তখন চল্লিশ। প্রথম ওহী আসার দৃশ্যটি ছিল খুব রহস্যময়। জিবরাইল (আ.) তাঁকে জড়িয়ে ধরে বললেন, "ইকরা" বা "পাঠ করুন"। এটি ছিল সূরা আলাক্বের প্রথম পাঁচটি আয়াত।
ওহী আসাটা কিন্তু সহজ ছিল না। জানো, ওহী আসার সময় তাঁর কানে টং টং করে ঘণ্টা বাজার মতো শব্দ হতো। প্রচণ্ড শীতের দিনেও তিনি ঘামতে শুরু করতেন। প্রথমবার ওহী পেয়ে তিনি বেশ ভয় পেয়েছিলেন। কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফিরে স্ত্রী খাদীজা (রা.)-কে বললেন তাঁকে চাদর দিয়ে ঢেকে দিতে। এরপর খাদীজা (রা.) তাঁকে নিয়ে গেলেন ওয়ারাকা বিন নওফেলের কাছে। সব শুনে ওয়ারাকা তাঁকে সাহস দিলেন।
ওয়ারাকা বিন নওফেল তাঁকে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন: এটি সেই বার্তাবাহক যাকে আল্লাহ মূসা (আ.)-এর নিকট পাঠিয়েছিলেন। আফসোস, আমি যদি সেদিন যুবক থাকতাম!

৩. 'আল-আমীন' বা এক বিশ্বস্ত মানুষের গল্প (চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য)
নবী হওয়ার আগে থেকেই মক্কাবাসীরা তাঁকে ডাকত 'আল-আমীন' বা বিশ্বাসী বলে। কারণ তিনি কখনো মিথ্যা বলতেন না। তাঁর চাল-চলন ছিল দেখার মতো। তাঁর গায়ের রং ছিল দুধে-আলতার মতো শুভ্র উজ্জ্বল। চোখের মণির সাদা অংশে ছিল হালকা লালচে আভা। তিনি যখন হাসতেন, মনে হতো পূর্ণিমার চাঁদের টুকরো ঝলমল করছে। তাঁর গায়ের ঘাম ছিল মুক্তার মতো উজ্জ্বল। জানো, উম্মে সুলাইম নামের এক মহিলা নবীজির ঘাম বোতলে ভরে রাখতেন, কারণ সেই ঘাম ছিল দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সুগন্ধি!
এত বড় মানুষ হয়েও তিনি ছিলেন খুব সাধারণ। তিনি নিজের জুতো নিজে সেলাই করতেন, কাপড়ে তালি দিতেন আর বকরির দুধ দোহন করতেন। তিনি কথা বলতেন খুব ধীরে ধীরে, যাতে সবাই বুঝতে পারে। প্রয়োজনে একটা কথা তিনবার বলতেন। আম্মাজান আয়েশা (রা.)-এর একটি কথা থেকে তাঁর আসল পরিচয় পাওয়া যায়।
আম্মাজান আয়েশা (রা.) বলেছেন: কুরআনই ছিল তাঁর চরিত্র।

৪. কঠিন সময়েও যিনি ভেঙে পড়েননি (দাওয়াত ও নির্যাতন)
নবীজি (সা.) প্রথম তিন বছর গোপনে ইসলামের দাওয়াত দেন। এরপর যখন প্রকাশ্যে প্রচার শুরু করলেন, তখন কাফেররা তাঁর ওপর অনেক অত্যাচার করল। উকবা বিন আবু মুয়িত নামের এক দুষ্টু লোক নবীজির গলায় চাদর পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করেছিল। এমনকি তিনি যখন নামাজ পড়তেন, তখন পিঠের ওপর উটের পচা নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দিত।
কাফেররা নবীজি ও তাঁর পরিবারকে তিন বছর একটি পাহাড়ের গুহায় (আবু তালিবের গিরি সংকট) আটকে রেখেছিল। সেখানে খাবারের অভাবে তাঁরা গাছের পাতা খেয়ে দিন কাটিয়েছেন। তায়েফের ময়দানে গিয়ে তিনি যখন দাওয়াত দিলেন, সেখানকার মানুষ তাঁকে পাথর মেরে রক্তাক্ত করে দিয়েছিল। কিন্তু আমাদের দয়ালু নবী তাদের অভিশাপ দেননি। তিনি শুধু বলেছিলেন, "ওরা বোঝে না, তাই এমন করছে।"

৫. আলোর পথে যাত্রা: হিজরত ও মদীনা
মক্কায় যখন থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ল, তখন তিপ্পান্ন বছর বয়সে তিনি আল্লাহর নির্দেশে মদীনায় হিজরত করলেন। তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন প্রিয় বন্ধু আবু বকর (রা.)। তাঁরা সাওর গুহায় তিন রাত লুকিয়ে ছিলেন। জানো, কাফেররা একদম গুহার মুখে চলে এসেছিল, কিন্তু আল্লাহ এক মাকড়সা দিয়ে জাল বুনিয়ে তাঁদের রক্ষা করলেন।
মদীনায় পৌঁছানোর পর তিনি কুবায় চৌদ্দ দিন ছিলেন এবং সেখানে প্রথম মসজিদ তৈরি করলেন। এরপর মদীনার ভেতরে যাওয়ার পর তাঁর উষ্ট্রীটি যেখানে গিয়ে বসে পড়ল, সেখানেই আজকের বিখ্যাত মসজিদে নববী তৈরি হলো।

৬. সত্যের জয়: বদর থেকে মক্কা বিজয়
মদীনায় গিয়েও তাঁকে অনেক লড়াই করতে হয়েছে। দ্বিতীয় হিজরীতে হলো বদর যুদ্ধ। সেখানে মাত্র ৩১৩ জন মুসলমান মিলে বিশাল কাফের বাহিনীকে হারিয়ে দিল। এরপর হলো উহুদ যুদ্ধ। সেখানে নবীজি (সা.) অনেক কষ্ট পেলেন, তাঁর সামনের একটি দাঁত ভেঙে গেল। খন্দক যুদ্ধের সময় সালমান ফারসী (রা.)-এর বুদ্ধিতে মদীনার চারদিকে গর্ত বা পরিখা খনন করা হলো।
অবশেষে অষ্টম হিজরীতে তিনি দশ হাজার সাহাবী নিয়ে মক্কা বিজয় করলেন। সেদিন তিনি চাইলে সব শত্রুকে শাস্তি দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি বললেন, "আজ তোমাদের ওপর আমার কোনো অভিযোগ নেই, তোমরা সবাই মুক্ত।" এমন উদারতা কি আর কেউ দেখাতে পারে?

৭. প্রিয় নবীর ঘর ও পরিবার (পারিবারিক জীবন)
নবীজি (সা.)-এর মোট সাতটি সন্তান ছিল। তিন ছেলে আর চার মেয়ে। তাঁর সবচেয়ে ছোট ছেলে ইব্রাহীম ছাড়া বাকি সব সন্তান ছিলেন প্রথম স্ত্রী খাদীজা (রা.)-এর গর্ভজাত। খাদীজার মৃত্যুর পর তিনি সাওদা (রা.) ও আয়েশা (রা.)-কে বিয়ে করেন।
পরিবারের সাথে তিনি ছিলেন খুব অমায়িক। তিনি খাবার খাওয়ার সময় তিন আঙুল ব্যবহার করতেন এবং খাওয়ার পর আঙুল চেটে নিতেন। খাবার শুরুতে বলতেন 'বিসমিল্লাহ' আর শেষে 'আলহামদুলিল্লাহ'। তিনি সাদা পোশাক পরতে খুব পছন্দ করতেন। একবার এক লোক তাঁকে দেখে কাঁপতে শুরু করলে তিনি কী বলেছিলেন জানো?
রাসূল (সা.) সেই লোকটিকে বলেছিলেন: শান্ত হও, আমি কোনো রাজা-বাদশা নই। আমি সেই মহিলার পুত্র যে শুকনো গোশত খেয়ে জীবনধারণ করত।

উপসংহার
রাসূল (সা.)-এর জীবন ছিল এক বিশাল সমুদ্রের মতো। মক্কার সেই তপ্ত ধূলিকণা থেকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সারা জাহানের মুক্তির আলো। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে মানুষের সেবা করতে হয়, কীভাবে বড় হয়েও সাধারণ থাকা যায়।
আজ এই মহৎ মহামানবের জীবন নিয়ে আমরা যেটুকু জানলাম, তা যেন শুধু জানার মধ্যেই আটকে না থাকে। আমরা কি পারি না আমাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজে সেই আল-আমীনের আদর্শটুকু ফিরিয়ে আনতে? আমাদের প্রতিটি কাজে সততা আর মুখে একটা মুচকি হাসি থাকলেই পৃথিবীটা আরও সুন্দর হবে। কি, পারবে না তোমরা?

শেয়ার করুন