প্রবন্ধ

All right reserved by the author & the respective writers

4 মিনিট পড়ার সময়

রাসূলের ﷺ প্রতি আমাদের ভালোবাসা: কয়েকটি আশ্চর্য ও গভীর উপলব্ধি

মহানবী ﷺকে আমরা কোনোদিন দেখিনি। জ্যোৎস্না রাতে একা বারান্দায় বসে থাকতে থাকতে কিংবা বৃষ্টির দুপুরে উদাস হয়ে জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কি কখনো তাঁর কথা ভেবে আমাদের চোখ ভিজে উঠেছে?

মোহাম্মদ আব্দুল আজিম
রাসূলের ﷺ প্রতি আমাদের ভালোবাসা: কয়েকটি আশ্চর্য ও গভীর উপলব্ধি

মহানবী কে আমরা কোনোদিন দেখিনি। জ্যোৎস্না রাতে একা বারান্দায় বসে থাকতে থাকতে কিংবা বৃষ্টির দুপুরে উদাস হয়ে জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কি কখনো তাঁর কথা ভেবে আমাদের চোখ ভিজে উঠেছে? সম্ভবত উঠেছে; আবার হয়তো নাগরিক জীবনের ব্যস্ততায় আমরা ভুলেই গিয়েছি এক পরম দয়ালু মানুষের কথা, যাঁর অধিকার আমাদের প্রতিটি নিশ্বাসে মিশে আছে। তিনি আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ ﷺ। তিনি শুধু আল্লাহর শেষ রাসূলই নন, তিনি আমাদের শিক্ষক এবং আমাদের প্রতি অতি দয়ার্দ্র এক রহম দিল মানুষ। মাঝে মাঝে বিষণ্ণ দুপুরে খুব সাধারণ একটা প্রশ্ন মাথায় ঘোরে: আমরা কি সত্যিই জানি আমাদের ওপর তাঁর অধিকার ঠিক কতখানি? নাকি আমরা কেবল উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কিছু প্রথা আর আবেগ পালন করে যাচ্ছি? এই লেখাটি কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার ডায়েরি নয়; বরং এটি আমাদের সেই না দেখা বন্ধুর সাথে একটি আত্মিক পুনর্দর্শনের যাত্রা।

ব্যক্তিগত ইচ্ছার ঊর্ধ্বে ভালোবাসা: একটি নীরব পরীক্ষা

ভালোবাসা শব্দটা শুনতে খুব চমৎকার মনে হলেও এর দাবি পূরণ করা বেশ কঠিন। আমরা দাবি করি আমরা নবীজিকে ভালোবাসি, কিন্তু ভালোবাসা কি কেবল মুখে স্বীকার করার নাম? রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যতক্ষণ আমরা আমাদের সন্তান, পিতা এবং সকল মানুষের চেয়ে তাঁকে অধিক প্রিয় মনে না করব, ততক্ষণ আমাদের ঈমান পূর্ণ হবে না। এই ‘অধিক প্রিয়’ হওয়ার বিষয়টি বেশ বৈপ্লবিক। এর অর্থ হলো: যখন আমাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা, জেদ কিংবা লালিত রাগ রাসূলের ﷺ সহিহ শিক্ষার বিপরীতে গিয়ে দাঁড়াবে, তখন আমরা বিনা বাক্যে নিজের নফস বা অহংকারকে বিসর্জন দেব। মুমিন হতে হলে নবীজিকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি হকদার মনে করতে হবে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যখন কারও ওপর খুব রাগ হয়, তখন আমাদের মন চায় প্রতিশোধ নিতে; অথচ নববী আদর্শ শেখায় ক্ষমা করতে। এখানেই আমাদের ভালোবাসার আসল পরীক্ষা: আমি কি আমার রাগকে জিতিয়ে দেব, নাকি আমার প্রিয় নবীজির সুন্নাহকে? আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এই বিষয়টি অত্যন্ত কঠোর ও স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন:

“আপনার রবের শপথ! তারা মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তাদের পারস্পরিক বিরোধে তারা আপনাকে বিচারক মেনে নেয়; অতঃপর আপনার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে নিজেদের মনে কোনো সংকীর্ণতা না পায় এবং পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে।” (সূরা আন-নিসা, ৪:৬৫)

ডিজিটাল সুন্নাহ: কিবোর্ড আর স্ক্রিনে নববী আদর্শ

আমরা অনেক সময় মনে করি সুন্নাহর মানে হলো কেবল মসজিদে গিয়ে কিছু নিয়ম পালন করা কিংবা বিশেষ কোনো পোশাক পরা। কিন্তু সুন্নাহর পরিধি আমাদের বেডরুম থেকে শুরু করে হাতের স্মার্টফোন পর্যন্ত বিস্তৃত। বর্তমান সময়ে আমাদের অধিকাংশ সময় কাটে ইন্টারনেটের দুনিয়ায়। আমরা কি জানি, ফেসবুকের কমেন্ট সেকশনে আমাদের আচরণও হতে পারে সুন্নাহর একটি অংশ? রাসূল ﷺ আমাদের শিখিয়েছেন নিজের জিহ্বা ও রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে। কেউ অনলাইনে আমাদের সাথে অভদ্রতা করলে তাকে পাল্টা গালি দেওয়া নববী আদর্শ নয়। কিবোর্ডে আঙুল চালানোর আগে আমাদের ভাবা উচিত: সুন্নাহ কেবল পোশাকে নয়, সুন্নাহ মিশে আছে আমাদের প্রতিটি অনলাইন ইন্টারঅ্যাকশনে:

* যেকোনো পরিস্থিতিতে কেবল সত্য কথা বলা।
* অনলাইনে কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করা; কারণ মিথ্যা ছড়ানো সুন্নাহর পরিপন্থী।
* গীবত, অপমান বা ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে বিরত থাকা।
* অশ্লীল ও কটু ভাষা ব্যবহার না করে ভাষার গাম্ভীর্য ও ভদ্রতা বজায় রাখা।
* অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ানোর চেয়ে নিজের চরিত্র সংশোধনে বেশি সময় দেওয়া।

সুন্নাহ আসলে একটি গভীর জীবনদর্শন, যা আমাদের শেখায় কীভাবে একজন মার্জিত ও রুচিশীল মানুষ হিসেবে নিজেকে সব জায়গায় উপস্থাপন করতে হয়।

সম্মান রক্ষার লড়াই যখন নিজের আচরণের আয়না

রাসূলের ﷺ প্রতি কোনো অবমাননা হলে একজন মুসলিমের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই সম্মান রক্ষা করার প্রকৃত পদ্ধতি কী? রাসূল ﷺ তো কেবল আমাদের জন্য নন, তিনি সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য ‘রহমত’ বা করুণা হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর সম্মান রক্ষা করার প্রকৃত অর্থ কখনোই জুলুম, অন্যায় বা সহিংসতা হতে পারে না। বরং তাঁর মর্যাদা রক্ষার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো তাঁর পবিত্র ও উজ্জ্বল চরিত্রকে নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি হিসেবে ফুটিয়ে তোলা। তাঁর সম্পর্কে ভুল ধারণাগুলোকে জ্ঞান ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে সংশোধন করতে হবে। একটি গভীর আত্ম-জিজ্ঞাসা আমাদের সবার প্রয়োজন: "আমি এখন যেভাবে প্রতিবাদ করছি, তাতে কি আমার দয়ালু নবী ﷺ খুশি হতেন?" আমাদের এমন কোনো কাজ করা উচিত নয় যা তিনি নিজেই অপছন্দ করতেন। দিনশেষে আমাদের সুশৃঙ্খল আর মার্জিত আচরণই হবে আমাদের রাসূলের ﷺ প্রতি ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ প্রমাণ।

সীরাত পাঠ: না দেখা বন্ধুর ডায়েরি পড়া

যাকে আমরা ভালোবাসি, তাকে তিল তিল করে জানার কৌতূহল আমাদের চিরন্তন। রাসূলের ﷺ জীবনী বা সীরাত পাঠ করা কেবল একটি ঐতিহাসিক কাজ নয়, বরং এটি একজন পরম বন্ধুর ব্যক্তিগত ডায়েরি পড়ার মতো গভীর এক অনুভূতি। তাঁর জন্মের পূর্বের সেই অন্ধকার আরবের অবস্থা থেকে শুরু করে উম্মতের জন্য তাঁর কান্নার দিনগুলো জানা আমাদের জন্য অপরিহার্য। তিনি শিশুদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন, দরিদ্রদের সাহায্য করতেন, এমনকি যারা তাঁকে অপমান করত তাদেরও অবলীলায় ক্ষমা করে দিতেন। তিনি আমাদের দেখেননি, তবুও আমাদের কল্যাণের জন্য তিনি কতটা চোখের জল ফেলেছেন, তা জানলে পাথরের মতো হৃদয়ও গলে যায়। সীরাত আমাদের শেখায় যে জীবনের চরম বিপদেও কীভাবে ধৈর্য ধরতে হয় আর সাফল্যের শিখরে পৌঁছেও কীভাবে বিনয়ী থাকতে হয়।আল্লাহ তাআলা বলেন:

“নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের কাছে একজন রাসূল এসেছেন। তোমাদের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টদায়ক; তিনি তোমাদের কল্যাণের প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আত-তাওবাহ, ৯:১২৮)

উপসংহার: একটি অসমাপ্ত চিঠির শেষ অংশ

আমাদের নবী ﷺ আমাদের জন্য এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপহার। তাঁর প্রতি আমাদের ভালোবাসা যেন কেবল বিশেষ কোনো দিনের উৎসবে আটকে না থাকে। তাঁর প্রতি বিশ্বাস রাখা, তাঁকে নিজের চেয়ে বেশি ভালোবাসা এবং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁর আনুগত্য করাই হলো তাঁকে প্রকৃত সম্মান জানানো। আসুন, আজ শোবার আগে নিজেকে একবার প্রশ্ন করি: প্রতিদিন অন্তত একটি ছোট সুন্নাহ কি আমরা আমাদের অভ্যাসে পরিণত করতে পারি? হতে পারে সেটি কেবল কারও সাথে দেখা হলে একটু মুচকি হাসা কিংবা কোনো কথা বলার আগে তার সত্যতা নিশ্চিত করা।

আল্লাহ এবং তাঁর ফেরেশতারা স্বয়ং নবীর ওপর দরূদ পাঠ করেন। তাই আমাদেরও উচিত সেই পবিত্র মিছিলে শামিল হওয়া। আল্লাহ আমাদের প্রিয় নবীর শাফাআত লাভের তৌফিক দান করুন এবং তাঁর আদর্শে আমাদের জীবন রঙিন করে দিন। আমিন।
 

শেয়ার করুন