প্রবন্ধ

All right reserved by the author & the respective writers

5 মিনিট পড়ার সময়

ঈদে মীলাদুন্নাবী (সা.): প্রথা ও বিধান নিয়ে ৫টি চমকপ্রদ ও গভীর অন্তর্দৃষ্টি

নবীজি (সা.) এর আগমনে আনন্দ প্রকাশ করা মুমিনের ঈমানের দাবি; তবে এই আনন্দের পূর্ণতা তখনই আসবে, যখন আমাদের আবেগ শরীয়তের অনুগত হবে এবং আমাদের জীবনে সুন্নাতের প্রকৃত অনুসরণ ও ইত্তিবা প্রতিফলিত হবে।

মোহাম্মদ আব্দুল আজিম
ঈদে মীলাদুন্নাবী (সা.): প্রথা ও বিধান নিয়ে ৫টি চমকপ্রদ ও গভীর অন্তর্দৃষ্টি

প্রারম্ভিকা: অন্তরের গভীর থেকে একটি জিজ্ঞাসা
মানব ইতিহাসের ধূসর মরুপ্রান্তরে যখন ইনসানিয়াতের কণ্ঠরোধ হতে চলেছিল, ঠিক তখনই মহান রবের সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার হিসেবে আবির্ভূত হলেন প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি কেবল একজন মহামানব নন, বরং তিনি হলেন 'রাহমাতুল্লিল আলামিন' বা বিশ্বজগতের জন্য মহান আল্লাহর সজল করুণার মূর্ত প্রতীক। তাঁর শুভাগমনে অন্ধকারাচ্ছন্ন আরবের বুক চিরে যে নবুওয়াতের চিরায়ত নূর বিকিরিত হয়েছিল, তা মানবসভ্যতার গতিপথকে চিরতরে বদলে দিয়েছে।

নবীজি (সা.) এর প্রতি কৃতজ্ঞতার সজল অভিবাদন জানানো এবং তাঁর শুভাগমনে আনন্দ প্রকাশ করা মুমিনের হৃদয়ের এক অনির্বাণ তামান্না। তবে এই খুশির বহিঃপ্রকাশ এবং 'মীলাদুন্নাবী' পালনের প্রচলিত পদ্ধতি নিয়ে সমসাময়িককালে অনেকের মনেই বিভিন্ন জিজ্ঞাসার উদ্রেক হয়। নবীপ্রেমের উত্তাল তরঙ্গ আর শরীয়তের সুশৃঙ্খল তীরের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব, তা আজ আমাদের গভীরভাবে তলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

আমাদের আজকের এই আলোচনা কোনো গতানুগতিক বিতর্ক নয়, বরং এটি হৃদয়ের সেই সুপ্ত ব্যাকুলতাকে শাস্ত্রীয় ও যৌক্তিক কাঠামোর নিরিখে একটি মার্জিত রূপ দেওয়ার প্রয়াস। নবীজি (সা.) এর প্রতি আমাদের আবেগ যেন সর্বদা ইত্তিবায়ে সুন্নাত বা আদর্শ অনুসরণের পথে ধাবিত হয়, সেটিই আমাদের মূল অন্বেষা।

১. 'ঈদ' শব্দের আভিধানিক ব্যবহার: শরীয়ত বনাম ভাষা
একটি প্রচলিত বিতর্ক হলো- ইসলামে ঈদ তো মাত্র দুটি, তবে মীলাদুন্নাবীকে 'ঈদ' বলা কি যুক্তিযুক্ত? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের শরীয়তের পারিভাষিক সংজ্ঞা এবং ভাষাগত বা আভিধানিক ব্যবহারের পার্থক্যটি স্পষ্ট করতে হবে। শরীয়তের বিধিবদ্ধ বিধানে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা, দুটিই হলো নির্ধারিত ঈদ। এর বাইরে কোনো নতুন শরয়ী ঈদ উদ্ভাবনের অবকাশ নেই।

কিন্তু আভিধানিক বা ভাষাগত অর্থে 'ঈদ' শব্দটি অত্যন্ত প্রশস্ত। আরবি লুগাত বা অভিধান অনুযায়ী, যেকোনো আনন্দের দিন কিংবা এমন কোনো মুহূর্ত যাতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বা দ্বীনি ঘটনার স্মৃতিরোমন্থন করা হয়, তাকেই 'ঈদ' বলা যায়। আলেমগণ এই আভিধানিক অর্থেই মীলাদুন্নাবীকে আনন্দের দিন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। 'আল-মুজামুল ওয়াসীত' গ্রন্থে বলা হয়েছে- যেকোনো প্রিয় স্মৃতির স্মরণে যখন মানুষ সমবেত হয়, সেই দিনটিই ঈদ।

ইমাম ইবনু আব্বাদ রুন্দী মালেকী (রহ.) এর বক্তব্যটি এ প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য:

"আর মাওলিদ বা জন্মদিনের ব্যাপারে কথা হলো, আমার মতে এটি মুসলিমদের ঈদ বা খুশির দিন এবং উৎসবের দিন।"

অনুরূপভাবে ইমাম ইবনে হাজার (রহ.) আল্লাহর দরবারে সেই ব্যক্তির জন্য রহমত কামনা করেছেন, যে এই মাসটিকে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করে আনন্দ প্রকাশ করে। সুতরাং এটি কোনো নতুন বিধান নয়, বরং ভাষাগত ব্যবহারের মাধ্যমে মহান নিআমতের শুকরিয়া প্রকাশ মাত্র।

২. ১২ই রবিউল আউয়াল কেন? ঐতিহাসিক মতভেদের মাঝে একটি যৌক্তিক সমাধান
নবীজি (সা.) এর নির্ভুল জন্ম তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে ১ তারিখ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত বিভিন্ন মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। তবে ১২ তারিখকে উদযাপনের জন্য বেছে নেওয়ার পেছনে একটি চমৎকার ও শাস্ত্রীয় যুক্তি রয়েছে।

উৎস তথ্যের আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, যেহেতু জন্ম তারিখ নিয়ে প্রধান মতভেদগুলো ১ থেকে ১২ তারিখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তাই ১২ তারিখে উদযাপন করলে সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকে না। যদি কেউ ১ তারিখে পালন করেন, তবে সম্ভাবনা থেকে যায় যে প্রকৃত জন্ম তারিখ হয়তো আরও পরে। আবার ৮ বা ৯ তারিখে পালন করলেও সংশয় জাগতে পারে যে নবীজি (সা.) এর শুভাগমনের আগেই উদযাপন করা হয়ে গেল কি না। কিন্তু ১২ তারিখে পালন করলে এটি সুনিশ্চিত যে, এই তারিখ অতিক্রান্ত হওয়ার পর নবীজি (সা.)-এর জন্মের ব্যাপারে আর কোনো দ্বিমত বাকি থাকে না। এটিই হলো এই তারিখ নির্ধারণের সবচাইতে যৌক্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান।

৩. কিয়াম: ইবাদত নাকি ভালোবাসার প্রাকৃতিক বহিঃপ্রকাশ?
মীলাদ মাহফিলের একটি বিশেষ অনুষঙ্গ হলো 'কিয়াম' বা দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন। এটি কোনো বাধ্যতামূলক শরীয়তি ইবাদত, ফরয কিংবা সুন্নাত নয়; বরং এটি হলো নবীপ্রেমিকদের একটি 'তবিয়তী' বা প্রকৃতিজাত আবেগের বহিঃপ্রকাশ।

আল্লামা মুহাম্মদ বিন আলভী মালেকী (রহ.) এর গভীর দৃষ্টিতে, কিয়াম হলো একটি 'মানসিক দৃশ্যকল্প'। যখন মুমিন তার হৃদয়ে কল্পনা করে যে সেই বরকতময় মুহূর্তে সারা বিশ্বে রহমতের ঢল নেমেছিল, তখন সেই শ্রেষ্ঠ নিআমতের সম্মানে সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দাঁড়িয়ে যায়। এটি কোনো শরয়ী বিধান নয় যে একে আবশ্যিক মনে করতে হবে। আল্লামা আলভী মালেকী (রহ.) স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন যে, একে ইবাদত বা সুন্নাত মনে করা সহিহ নয় এবং এ নিয়ে বাড়াবাড়ি বা দলাদলি করাও অনুচিত।

ফুরফুরার পীর আবু বকর সিদ্দিকী (রহ.) তাঁর অসিয়ত নামায় এই ভালোবাসার ভারসাম্য প্রকাশ করেছেন এভাবে:

"মীলাদ শরীফে কেয়াম করা মোস্তাহসান... সামান্য মোস্তাহসান বিষয় লইয়া কেহ দলাদলি করিয়া বিভক্ত হইবেন না। কেয়াম করা আমি ভাল মনে করি।"

হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ.) এর কাছে এটি ছিল আত্মিক প্রশান্তির আকর, যা তিনি কেবল বরকতের ওসিলা হিসেবে গ্রহণ করতেন।

৪. বৈধ ও অবৈধ উদযাপনের সীমারেখা: যা আমাদের মনে রাখা জরুরি
নবীজি (সা.) এর আগমনে আনন্দ প্রকাশ করা যেমন মুমিনের ভূষণ, তেমনি সেই আনন্দ যেন শরীয়তের সীমারেখা অতিক্রম না করে তা নিশ্চিত করাও ঈমানী দায়িত্ব। নিম্নে উৎস তথ্যের ভিত্তিতে একটি নির্দেশিকা প্রদান করা হলো:

বৈধ ও মুস্তাহসান পদ্ধতি:

* উন্নত মানের খাবারের আয়োজন করে দরিদ্র ও অসহায়দের আপ্যায়ন করা।
* ওয়াজ মাহফিল ও আলোচনার মাধ্যমে নবীজি (সা.) এর সীরাত, সুন্নাত ও আদর্শ প্রচার করা।
* মৌলিক ঈমানী চেতনাদীপ্ত হামদ-নাত ও ইসলামী সংগীত পরিবেশন।
* অধিক পরিমাণে দরুদ ও সালাম পাঠ করে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানানো।

বর্জনীয় ও অবৈধ বিষয়:

* বাদ্যযন্ত্র বা মিউজিকের ব্যবহার।
* পর্দার বিধান লঙ্ঘন করে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা।
* ভ্রান্ত আকিদা পোষণ করা যে, নবীজি (সা.) তাঁর নিজস্ব ক্ষমতাবলে সর্বত্র 'হাজির-নাজির' হন।
* নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতিকে শরীয়ত অনুযায়ী বাধ্যতামূলক বা ফরয-ওয়াজিব মনে করা।
* যারা কিয়াম বা প্রচলিত মাহফিলের আয়োজন করে না, তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা বা সমাজচ্যুত করা।

৫. একটি অবিচ্ছিন্ন পরম্পরা: যুগশ্রেষ্ঠ আলেমদের সমর্থন
মীলাদুন্নাবী পালন কোনো সাময়িক হুজুগ বা আধুনিককালের উদ্ভাবন নয়। এটি সপ্তম হিজরি শতাব্দী থেকে আজ পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর এক নিরবচ্ছিন্ন ঐতিহ্যের অংশ। ইমাম আবু শামাহ (৭ম শতাব্দী), প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইমাম ইবনু খলদুন (৮ম শতাব্দী) থেকে শুরু করে পরবর্তী যুগের প্রায় ৬৪ জন যুগশ্রেষ্ঠ ইমাম ও মুহাদ্দিস এই উদযাপনকে 'বিদআতে হাসানা' বা উত্তম কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

এই ঐতিহ্যের শিকড় কত গভীরে, তা বোঝা যায় একটি ঐতিহাসিক ঘটনায়। ভারতীয় উপমহাদেশের হাদীস শাস্ত্রের অনন্য ব্যক্তিত্ব শাহ আব্দুল গনী মুজাদ্দেদী (রহ.) যিনি দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা আকাবীরগণেরও উস্তাদ ছিলেন, তিনি মদীনা শরীফের মসজিদে নববীতে আয়োজিত মীলাদ মাহফিলের হালকায় সশরীরে উপস্থিত থাকতেন। এমনকি মিম্বরের পাশে আয়োজিত সেই মাহফিলে উপস্থিত থেকে তিনি ও তাঁর ছাত্রগণ বরকত লাভ করতেন। শাহ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) থেকে শুরু করে হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ.) পর্যন্ত মহান মনীষীদের এই সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, এটি উম্মাহর এক অবিচ্ছিন্ন আধ্যাত্মিক পরম্পরা।

উপসংহার: হৃদয়ে নবীপ্রেমের প্রজ্বলন
ঈদে মীলাদুন্নাবী (সা.) এর মূল প্রতিপাদ্য হলো মহান আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নিআমতকে স্বীকার করা এবং নবীজি (সা.) এর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো। বাহ্যিক জাঁকজমক বা যান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতা কখনো নবীপ্রেমের বিকল্প হতে পারে না। আমাদের ভালোবাসা যেন কেবল বাৎসরিক একটি আয়োজনেই থমকে না যায়, বরং তা যেন আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর সুন্নাতের প্রতিফলন ঘটায়।

আমাদের আজকের এই পথচলা কি কেবল ভাবাবেগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি এটি আমাদের জীবনে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর জীবন্ত আদর্শকে জিন্দা করার প্রেরণা জোগাবে?

চূড়ান্ত টেকঅ্যাওয়ে: ’’নবীজি (সা.) এর আগমনে আনন্দ প্রকাশ করা মুমিনের ঈমানের দাবি; তবে এই আনন্দের পূর্ণতা তখনই আসবে, যখন আমাদের আবেগ শরীয়তের অনুগত হবে এবং আমাদের জীবনে সুন্নাতের প্রকৃত অনুসরণ ও ইত্তিবা প্রতিফলিত হবে।’’
 

শেয়ার করুন