প্রবন্ধ

All right reserved by the author & the respective writers

3 মিনিট পড়ার সময়

পবিত্র সুরের মায়াবী জাদুকর: আল্লামা ফুলতলী ছাহেব ক্বিবলাহ (রাহঃ) এবং ইলমে কিরাতের এক বিস্ময়কর অধ্যায়

মানুষটা বড় অদ্ভুত ছিলেন। তাঁর হাঁটাচলা, রহস্যময় চাউনি কিংবা আধ্যাত্মিক নীরবতার আড়ালে এমন এক মায়া মিশে থাকত, যা সাধারণ মানুষের বোধগম্যের বাইরে। শৈশবেই মমতাময়ী মাকে হারালেন, কৈশোরে পৌঁছাতে না পৌঁছাতে মাথা থেকে পিতার ছায়াও সরে গেল। এতিম সেই কিশোরের হাত ধরলেন তাঁরই উস্তাদ বদরপুরী (র.)। এই নিঃসঙ্গ পথচলাই বোধহয় তাঁকে পরম সত্তার আরও কাছে নিয়ে গিয়েছিল। অনেকে তাঁকে মুগ্ধ হয়ে দেখতেন আর ভাবতেন; ইনি তো কেবল একজন আলেম নন, ইনি যেন এক ‘খাঁটি নায়েবে নবী’। তাঁর সম্পর্কে কবি রুহুল আমীন খাঁনের সেই পঙক্তিটি বড়ই জুতসই: "রাসূল দেখিনি বটে তাঁরই এক মূর্তমান ছবি নবী তুমি ছিলে নাকো, ছিলে তাঁর প্রতিনিধি হে নায়েবে নবী।"

মোহাম্মদ আব্দুল আজিম
পবিত্র সুরের মায়াবী জাদুকর: আল্লামা ফুলতলী ছাহেব ক্বিবলাহ (রাহঃ) এবং ইলমে কিরাতের এক বিস্ময়কর অধ্যায়

মানুষটা বড় অদ্ভুত ছিলেন। তাঁর হাঁটাচলা, রহস্যময় চাউনি কিংবা আধ্যাত্মিক নীরবতার আড়ালে এমন এক মায়া মিশে থাকত, যা সাধারণ মানুষের বোধগম্যের বাইরে। শৈশবেই মমতাময়ী মাকে হারালেন, কৈশোরে পৌঁছাতে না পৌঁছাতে মাথা থেকে পিতার ছায়াও সরে গেল। এতিম সেই কিশোরের হাত ধরলেন তাঁরই উস্তাদ বদরপুরী (র.)। এই নিঃসঙ্গ পথচলাই বোধহয় তাঁকে পরম সত্তার আরও কাছে নিয়ে গিয়েছিল। অনেকে তাঁকে মুগ্ধ হয়ে দেখতেন আর ভাবতেন; ইনি তো কেবল একজন আলেম নন, ইনি যেন এক ‘খাঁটি নায়েবে নবী’। তাঁর সম্পর্কে কবি রুহুল আমীন খাঁনের সেই পঙক্তিটি বড়ই জুতসই:

"রাসূল দেখিনি বটে তাঁরই এক মূর্তমান ছবি নবী তুমি ছিলে নাকো, ছিলে তাঁর প্রতিনিধি হে নায়েবে নবী।"

আমাদের এই বাংলায় কুরআনের অর্থ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়, কিন্তু এর তিলাওয়াতের সুর যে কতটা বিশুদ্ধ হওয়া প্রয়োজন, তা হয়তো অজানাই থেকে যেত যদি না এই মানুষটি একে একটি আন্দোলনের রূপ দিতেন। তাঁর জীবনের গল্পটা কোনো সাধারণ সাফল্যের গল্প নয়, বরং এক শেকড় সন্ধানী মুসাফিরের কাহিনী।

তিনি ইলমে কিরাতের জ্ঞান অর্জন করেছিলেন তিনটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও দুর্লভ ধারায়। প্রথমত, তিনি তাঁর মুর্শিদ কুতুবুল আকতাব আবু ইউসুফ শাহ মোঃ ইয়াকুব বদরপুরী (র.) এর কাছে কিরাতের পাঠ নেন। কিন্তু তাঁর সুরের তৃষ্ণা মিটেনি। তিনি সনদ লাভ করেন মাওলানা হাফিজ আব্দুর রউফ করমপুরী (র.)-এর কাছ থেকে, যাঁর সিলসিলা বিশ্বখ্যাত ক্বারী ইরকুসুস মিশরীর সাথে যুক্ত। আর তৃতীয় ধারাটি ছিল সরাসরি মক্কার রইছুল কুররা শায়খ আহমদ হিজাযী (র.)-এর মাধ্যমে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই প্রতিটি সিলসিলা ইমাম আবূ আমর আদ্ দানী (র.)-এর মাধ্যমে সরাসরি নবী করীম (সা.) পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই যে শেকড়ের সন্ধান, এটাই তাঁকে সবার থেকে আলাদা করে দিয়েছিল।

গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত, কিন্তু হলো না। ১৯৪৪ সালের কথা। মক্কা শরীফে এক বাঙালির তিলাওয়াত নিয়ে এক অদ্ভুত নাটকীয়তা তৈরি হলো। রইছুল কুররা হযরত আহমদ হিজাযী (র.)-এর সামনে হাজির হলেন ফুলতলী ছাহেব। শায়খ হিজাযী প্রথমে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করলেন; তাঁর ধারণা ছিল হিন্দুস্থানী বা আজমী লোকরা আরবী হরফ সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারে না। কিন্তু ফুলতলী ছাহেব যখন তিলাওয়াত শুরু করলেন, তখন শায়খ বিমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন। সেই সংশয় মুহূর্তেই বিস্ময়ে রূপ নিল। তিনি ফুলতলী ছাহেবকে প্রথম চার মাসে ১৩ পারা নিবিড়ভাবে পড়ালেন। এরপর ১৯৪৬ সালে তিনি পুনরায় মক্কায় গিয়ে বাকি ১৭ পারা শেষ করেন। ভারতীয় উপমহাদেশের একমাত্র ছাত্র হিসেবে তিনি সরাসরি শায়খ হিজাযীর কাছ থেকে এই বিরল সনদ লাভ করেন এবং পবিত্র হারাম শরীফে কুরআন পড়ানোর বিরল সুযোগ পান।

তৎকালীন সমাজে একটি অদ্ভুত বিতর্ক ছিল 'দ্বোয়াদ' (ض) হরফের উচ্চারণ নিয়ে। অনেক বড় বড় পণ্ডিত তখন দাবি করতেন, 'দ্বোয়াদ'কে 'যোয়াদ' বলাই নাকি আসল পাণ্ডিত্য। আল্লামা ফুলতলী (রাহঃ) দেখলেন, এটি কেবল একটি উচ্চারণগত ত্রুটি নয়, এটি কুরআনের অলৌকিক ধ্বনিমাধুর্যের বিকৃতি। তিনি এক নীরব কিন্তু প্রচণ্ড শক্তিশালী সংগ্রাম শুরু করলেন। তিনি মাহফিলে মাহফিলে বোঝাতে শুরু করলেন যে তিলাওয়াতের বিশুদ্ধতা কতটা জরুরি। এই পরিবর্তনকে তিনি কেবল একটি সংশোধন হিসেবে দেখেননি, বরং একে একটি বিশুদ্ধ উচ্চারণ বিপ্লব হিসেবে চিত্রিত করেছেন। আজ যে আমরা শুদ্ধ উচ্চারণে কুরআন পড়ি, তার নেপথ্যে এই মানুষটির সেই নিঃশব্দ লড়াই মিশে আছে।

ফুলতলী ছাহেবের এই গভীর জ্ঞান কেবল মৌখিক ছিল না, তিনি তা লিপিবদ্ধ করে গেছেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-কাউলুছ ছাদীদ’ -এ। তাজবীদ শাস্ত্রের ওপর লেখা একটি মাত্র বই যে কতটা প্রভাবশালী হতে পারে, এটি তার প্রমাণ। বইটির গুরুত্ব বিবেচনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে একে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। "বিশুদ্ধ ভাবে আল ক্বোরআন তিলাওয়াত শিখার ক্ষেত্রে এর বিকল্প নেই।"

ব্যক্তিগত সাধনার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি এই সুরের ধারা ছড়িয়ে দিতে চাইলেন সাধারণ মানুষের মাঝে। জন্ম নিল ‘দারুল ক্বিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট’। এটি ছিল তাঁর এক বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক মহীরুহ। দারুল কিরাত মসজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্টের ২০১৮ সালের রেকর্ড অনুযায়ী নতিভূক্ত কারী ছিলেন ১২,৪৩৪ জন। নিশ্চয়ই এত বছর পরে এর দ্বিগুণ হওয়ার কথা। ট্রাস্টের ২০১৮ সালের রেকর্ড অনুযায়ী ৪,৩৬,৭১৮ জন ছাত্রছাত্রী অনুমোদিত শাখায় অধ্যায়নরত ছিল।

তিনি একক প্রচেষ্টায় এমন এক একাডেমিক সিস্টেম তৈরি করেছিলেন, যেখানে হাজার হাজার ক্বারী তৈরি হয়েছে। ছাহেব কিবলাহ তাঁর ভূ-সম্পত্তির বিশাল অংশ (৩৩ একর) এই ট্রাস্টের নামে ওয়াকফ করে দিয়েছেন। বর্তমানে এই বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রায় দুই সহস্রাধিক শাখাকেন্দ্র দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে রয়েছে।

ঐতিহ্যবাহী ফুলতলীতে অনুষ্ঠিত ২০০২ সালের সেই ঐতিহাসিক ‘ক্বিরাত সম্মেলন’ এর কথা ভাবলে আজও গা শিউরে উঠে, যেখানে হাজার হাজার ক্বারী সাহেবের মাথায় সবুজ পাগড়ি পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিরাতের ইতিহাসে এমন দৃশ্য সত্যিই বিরল।

আল্লামা ফুলতলী ছাহেব ক্বিবলাহ (রাহঃ) আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সেই বিশুদ্ধ সুরের ঝঙ্কার লক্ষ লক্ষ কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে। তিনি শিখিয়ে দিয়ে গেছেন যে, আল্লাহর কালাম পড়ার সময় বিনয় আর বিশুদ্ধতা কতটা অপরিহার্য। লক্ষ লক্ষ মানুষের কণ্ঠে তিনি যে সুর বুনে দিয়ে গেছেন, তা কি কখনো মুছে যাবে? প্রতি বছর তাঁর গড়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠান থেকে কি হাজার হাজার বিশুদ্ধ কুরআন শরীফ তিলাওয়াতকারী (ক্বারী) তৈরি হচ্ছে না? প্রশ্নটা আপনাদের জন্য রেখে গেলাম!

শেয়ার করুন