ইসলামের কন্ঠইসলামের কন্ঠ
সম্পাদকীয়আর্কাইভআমাদের পরিচিতিলেখা পাঠানোর নিয়মাবলীযোগাযোগের মাধ্যম
হাদীস শরীফ

বড় ছাহেবের ছোটো চেয়ার

অর্ধ পৃথিবী করেছ শাসন ধুলার তখতে বসি খেজুরপাতার প্রাসাদ তোমার বারে বারে গেছে খসি (কাজী নজরুল ইসলাম) খলিফাতুল মুসলিমিন হযরত উমর ফারুক (রাঃ) অর্ধ পৃথিবী শাসন করেছেন কোন রাজ সিংহাসন ছাড়াই। কবি নজরুল সেটাকে ধুলার তখত্ বলে আখ্যায়িত করেন। ইসলাম এমন একটি ধর্ম যাকে পরশ পাথরের সাথে তুলনা করেন কবি। তিনি বলেন " ইসলাম - সে তো পরশ-মানিক তাকে কে পেয়েছে খুঁজি? পরশে তাহার সোনা হল যারা তাদেরেই মোরা বুঝি"

ইসলামের কন্ঠ
বড় ছাহেবের ছোটো চেয়ার

অর্ধ পৃথিবী করেছ শাসন ধুলার তখতে বসি

খেজুরপাতার প্রাসাদ তোমার বারে বারে গেছে খসি

(কাজী নজরুল ইসলাম)

খলিফাতুল মুসলিমিন হযরত উমর ফারুক (রাঃ) অর্ধ পৃথিবী শাসন করেছেন কোন রাজ সিংহাসন ছাড়াই। কবি নজরুল সেটাকে ধুলার তখত্ বলে আখ্যায়িত করেন। ইসলাম এমন একটি ধর্ম যাকে পরশ পাথরের সাথে তুলনা করেন কবি। তিনি বলেন

" ইসলাম - সে তো পরশ-মানিক তাকে কে পেয়েছে খুঁজি?

পরশে তাহার সোনা হল যারা তাদেরেই মোরা বুঝি"

হযরত উমর ফারুক (রাঃ) জেরুজালেম আসার কাহিনিও আমাদের সকলের জানা। খলিফা যখন ভৃত্যকে উটে চড়ার কথা বলেন ভৃত্য আশ্চর্য হলেন। তিনি অস্বীকৃতি জানান, এটা কেমন করে সম্ভব? খলিফা উটের রশি ধরে পথ চলবেন আর ভৃত্য উটের পিঠে চড়ে যাবে!

কবির ভাষায়ঃ .

"ভৃত্য দস্ত চুমি

কাঁদিয়া কহিল, 'উমর! কেমনে এ আদেশ কর তুমি?

উষ্ট্রের পিঠে আরাম করিয়া গোলাম রহিবে বসি

আর হেঁটে যাবে খলিফা উমর ধরি সে উটের রশি"

অর্ধ জাহানের শাসকের ধুলোমাখা ছেড়া জামা, বিভিন্ন জায়গায় তালি, হাতে উটের রশি!খলিফা হেটে চলেন, ভৃত্য উটের পিঠে।

কবির ভাষায়ঃ

"ভৃত্য চড়িল উটের পৃষ্ঠে উমর ধরিল রশি,

মানুষে স্বর্গে তুলিয়া ধরিয়া ধুলায় নামিল শশী।

জানি না, সেদিন আকাশে পুষ্প বৃষ্টি হইল কিনা,

কি গান গাহিল মানুষে সেদিন বন্দী' বিশ্ববীণা।

তখন ছিলো মুসলমানদের স্বর্ণযুগ। ছিলেন উমরের মতো নেতা। রাতের অন্ধকারে খলিফা রাজ্য ঘুরে বেড়াতেন, কোন ক্ষুধার্ত মানুষ কিংবা অন্য কোন প্রাণীর খোঁজে। খলিফার যুগ পরে তাবেয়ী, তবে তাবেয়ী হয়ে চলে এর ধারাবাহিকতা। উমর ইবনে আব্দুল আজিজের সময়ে রাজ্যে ঘোষণা দিয়ে খুঁজেন কোন অভাবী লোক আছে কি-না? এমন ছিলো তাদের শাসন ব্যবস্থা।

যুগে যুগে মানুষ বদলায়, নতুন প্রজন্মের আগমন ঘটে, বদলায় শাসক গোষ্ঠী । আরব সহ সারা বিশ্বের মুসলিম শাসকরা নিজ আদর্শ ভুলে সম্পদ ও বিলাসিতার পিছনে ছুটতে থাকে। হারিয়ে যায় পরিশ্রমের মনোভাব। অলসতা ও বিলাসিতার কারনে আমাদের থেকে ধীরে ধীরে বিদায় নেয় বিশ্ব নেতৃত্ব। আমাদের উপমহাদেশে ইসলাম আগমনের পর মুসলমানদের মধ্যে এর প্রভাব একটু বেশি দেখা যায়। মুসলিম শাসকগন বড়ো বড়ো অট্টালিকা নির্মাণ আর অলসতার মধ্যেই মজে থাকেন৷ সম্রাট শাহজাহানের জীবনী পড়লেই সেটা পরিস্কার ধারণা পাওয়া যাবে। সম্রাট নিজের রাজ্য পরিচালনার জন্য নির্মাণ করেন ৭টি সিংহাসন। এর মধ্যে সব থেকে দামি সিংহাসন হলো " ময়ূর সিংহাসন "। এই সিংহাসনটি তৈরি করতে সময় লাগে ৮ বছর। সম্রাট শাহজাহান তাজমহল নির্মাণের থেকে দ্বিগুণ বেশি অর্থ ব্যয় করেন এটি তৈরিতে। ব্যবহার করা হয় পৃথিবীর বিখ্যাত সব মনি-মুক্তা, হীরা, জহরত। পরবর্তীতে ভারতবর্ষে নাদির শাহ আক্রমণ করে ছিনিয়ে নেয় ময়ূর সিংহাসন। এর শেষ পরিণতি কী হয়েছিলো তার সঠিক কোন তথ্য পাওয়া যায় না। ধারণা করা হয় নাদির শাহের কাছ থেকে দূর্বৃত্তরা এটি ছিনতাইয়ের সময় নাদির শাহকেও হত্যা করে। কালের গর্ভে হারিয়ে যায় সম্রাটের বিখ্যাত ময়ূর সিংহাসনও।

ধীরে ধীরে শাসকদের থেকে বিদায় নেয় উমর ফারুকের আদর্শ, তাদের উপর ভর করে চাকচিক্যময়তা। শাসক হন অলস আর বিলাসী। তাদের থেকে উমর ফারুকের আদর্শ বিদায় নিলেও যুগে যুগে একদল মানুষ সেই আদর্শকে বাস্তবায়ন করে আসছে। ক্ষমতার লোভ না করে যুগে যুগে কিছু মানুষ হয়ে যান অঘোষিত বাদশা। যাদের নেই কোন ময়ূর সিংহাসন, নেই কোন রাজপ্রাসাদ। তারা দেশ থেকে দেশে ছড়িয়ে দেন ইসলামের আলো।

সুলতানুল হিন্দ বা হিন্দুস্তানের বাদশা হিসাবে পরিচিত খাজা গরিবে নেওয়াজ। হিন্দুস্তানে লক্ষ লক্ষ মানুষ যার হাতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। গরিবে নেওয়াজের ছিলো না কোন সিংহাসন, ছিলো না কোন রাজপ্রাসাদ। শাহজালাল ইয়ামনি (রঃ) কে বলা হয় সুলতানুল বাঙ্গাল। জালিম শাসক গৌড় গোবিন্দকে উচ্ছেদ করে উপমহাদেশে যিনি ইসলাম প্রচার ও প্রসারে সব থেকে বড়ো ভূমিকা পালন করেন। সুলতানুল বাঙ্গাল হওয়ার পরও ছিলো না তার কোন রাজ সিংহাসন। ছিলো না বিশাল অট্টালিকা। অথচ তিনি সুলতানুল বাঙ্গাল বা বাংলার বাদশা হিসাবেই পরিচিত। সৈয়দ আহমদ শহীদ বেরলভী (রঃ) কে বলা হয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বীর সিপাহসালার। শক্তিশালী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যিনি বালাকোটের ময়দানে যুদ্ধে শহিদ হন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের এই বীর সিপাহসালারেরও ছিলো না কোন রাজ সিংহাসন। এভাবেই যুগে যুগে আল্লাহর কিছু প্রিয় বান্দা হযরত উমর ফারুক (রাঃ) এর আদর্শ নিজের মধ্যে বাস্তবায়ন করে আসছেন। অথচ চাইলে এসকল আল্লাহর ওলিরাও তৈরি করতে পারতেন বিশাল অট্টালিকা, থাকতো বিশাল সাম্রাজ্য, নিজেদেরকে পরিচয় দিতেন বাদশা। এসকল ওলিরা তা না করে থেকে গেছেন প্রচারের আড়ালে। নিজেদেরকে লুকিয়ে রেখেছেন দুনিয়ার বিলাসিতা থেকে। ধারণ করেছেন খলিফা উমরের আদর্শ।

বর্তমান সময়েও এরকম কিছু মানুষ আমাদের সমাজে রয়েছেন। যারা নিজেদেরকে রেখেছেন আড়ালে। চাইলে বিলাসী জীবন যাপন করতে পারতেন, সেটা না করে মিশেছেন সাধারণ মানুষের কাতারে। রাতের অন্ধকারে পাহাড় থেকে পাহাড়ে সন্ধান করেন অভাবী, দুঃখী মানুষের। নিজের হাতে গড়ে দেন মানুষের ঘরের ভাঙা চালা। কোথায় কোন অভাবী মা না খেয়ে আছে, কোন এতিমের ঘরে খাবার নেই, কোন বিধবার ঘরে বৃষ্টির পানি পড়ে, এসব সন্ধান করে চলে যান তাদের দুয়ারে দুয়ারে।

নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছেন মানুষের তরে। ত্যাগ করেছেন আরাম আয়েশ। দায়িত্ব নিয়েছেন হাজার হাজার এতিমের। নির্যাতিত, এতিম, অসহায় মানুষের পাশেই কাটিয়ে দিচ্ছেন নিজের জীবন। এরকম মানুষও বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজেই আছে এটা শুনে অবাক হলেন? অবশ্যই আছেন, বলছি আমাদের রাহবার (আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী) বড় ছাহেবের কথা। যে ব্যক্তি চাইলে বসতে পারতেন বিশাল আকারের সিংহাসনে, যিনি চাইলে নির্মাণ করতে পারতেন বিশাল অট্টালিকা। আরাম, আয়েশে কাটিয়ে দিতে পারতেন নিজের জীবন, তিনি তা করেন নি। যার বসার আসনের দিকে তাকালে মনে পড়ে হযরত উমর ফারুকের আদর্শ।

নিম কাঠের একটা চেয়ার, আরাম ত্যাগ করার জন্য সেই চেয়ারে রাখেন নি হেলান দেয়ার ব্যবস্থা। সামনে একটা সবুজ চাদর। এই আসনেই বসে দারস দিচ্ছেন হাদিসের, শিখাচ্ছেন শুদ্ধ ক্বিরাত। সামনে বসে আছে দেশের অতি সাধারণ থেকে শীর্ষ পর্যায়ের মানুষ। এই চেয়ারে বসেই খবর নিচ্ছেন কোথায় কোন অভাবী মায়ের ঘরে আজ রান্না হয়নি, কোন এতিম শিশু পিতার অবর্তমানে কষ্টে আছে৷ কোন বিধবা অভাবের কারনে সারাতে পারছে না ঘরের ভাঙা চালা। খবর নিচ্ছেন, ছুটে যাচ্ছেন মানুষের দুয়ারে দুয়ারে। মানুষের খেদমতে বিলিয়ে দিচ্ছেন নিজের জীবন। নেই কোন আরাম কেদারা , সম্রাট শাহজাহানের ময়ূর সিংহাসনও হারিয়ে যায় কালের গর্ভে। কিন্তু এসব মনীষীদের ধুলোর তখ্ত কখনো হারায় না। যুগে যুগে উমর ফারুকের আদর্শ কিছু আল্লাহর ওলিরা ধারণ করে চলেছে ।

কবির ভাষায়ঃ

রোজ-কিয়ামতে কে বহিবে বল আমার পাপের ভার?

মম অপরাধে ক্ষুধায় শিশুরা কাঁদিয়াছে, আজি তার

প্রায়শ্চিত্ত করিব আপনি' - চলিলে নিশীথ রাতে

পৃষ্ঠে বহিয়া খাদ্যের বোঝা দুখিনীর আঙিনাতে।

আমাদের সৌভাগ্য আমরা এরকম একজন রাহবার পেয়েছি। যার পরিচয় দিতে গিয়ে আমরা বলতে পারি," মঞ্চে সব থেকে ছোটো যে চেয়ার সেটাই আমাদের বড়ো ছাহেবের"।

সাদিক আহমদ

শিক্ষার্থী, নর্থামব্রিয়া ইউনিভার্সিটি, নিউক্যাসল।

লেখাঃ ২৬-৯-২০২০