মানুষের মন বড় বিচিত্র। সে সব সময় আনন্দের উছিলা খোঁজে। এই ধূসর পৃথিবীতে একটুখানি আলো আর একটুখানি হাসির জন্য সে ব্যাকুল থাকে। সৃষ্টির নিয়মই এমন যে, যা কিছু সুন্দর তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই। ঈদে মিলাদুন্নবী তেমনই এক আলোর দিন। এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট তারিখের উৎসব নয়, এটি হলো এক গভীর কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসার গল্প। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) এর আগমনে পৃথিবী যে আলোকবর্তিকা পেয়েছিল, তার শুকরিয়া জানানোর নামই মিলাদ। একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবলে দেখা যায়, এই কৃতজ্ঞতা বোধটুকু আমাদের ভেতরে এমনিতেই থাকার কথা ছিল।
আল্লাহ নিজেই কি খুশির নির্দেশ দেননি?
অনেকে হয়তো ভাবেন, এই যে এত আয়োজন আর খুশি, এর ভিত্তি কী? পবিত্র কোরআনের সুরা ইউনুসের ৫৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের খুশির নির্দেশ দিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহর অনুগ্রহ এবং দয়া যখন বান্দার ওপর আসে, তখন আনন্দ প্রকাশ করা উচিত। এখন একটু ভেবে দেখুন। নবীজীর চেয়ে বড় দয়া বা রহমত আমাদের জন্য আর কী হতে পারে? তিনি তো খোদ 'রহমাতুল্লিল আলামিন'। সুতরাং তাঁর আগমনে খুশি হওয়া কেবল আবেগ নয়, এটি একটি খোদায়ী নির্দেশ পালনও বটে।
"বলুন, এটি আল্লাহর অনুগ্রহে ও তাঁর দয়ায় (যা মুহাম্মদী সত্তার মাধ্যমে তোমাদের কাছে পৌঁছেছে)। সুতরাং এতেই মুমিনদের আনন্দিত হওয়া উচিত। এটি তাদের সঞ্চিত সব ধন-সম্পদ অপেক্ষা শ্রেয়।" [সুরা ইউনুস, ১০:৫৮]
নবীজীর নিজের আমল: সোমবারের রোজা
আমাদের নবীজী (সা.) কি নিজে নিজের জন্ম নিয়ে কিছু করেছেন? সহিহ মুসলিম শরীফের ১১৬২ নম্বর হাদিস আমাদের সেই উত্তর দেয়। সাহাবীরা যখন তাঁকে সোমবারের রোজা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি খুব সুন্দর একটি উত্তর দিলেন। তিনি বললেন, এই দিনেই তিনি দুনিয়ায় এসেছেন। অর্থাৎ নবীজী (সা.) প্রতি সপ্তাহে এই দিনটিতে রোজা রেখে আল্লাহর দরবারে শোকর বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন যে, নিজের আগমনের দিনটি ইবাদত আর স্মরণের মাধ্যমে উদযাপন করা কতটা মর্যাদার। এটিই হলো প্রকৃত শুকরিয়া।
"রাসূলুল্লাহ (সা.) কে সোমবারের রোজা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, এটি সেই দিন যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং যেদিন আমার ওপর কোরআন নাযিল করা হয়েছে।" [মুসলিম শরীফ, হাদিস: ১১৬২]
এটি কি শিরক, নাকি তাওহীদের দলিল?
মাঝে মাঝে কিছু মানুষ ভুল বুঝে মনে করেন মিলাদ পালন করা হয়তো শিরক বা বিদআত। অথচ একটু গভীর দৃষ্টিতে তাকালে দেখা যায় মিলাদ আসলে তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদের এক বড় প্রমাণ। পবিত্র কোরআনেও আমরা দেখি হযরত ইয়াহইয়া (আ.) এবং হযরত ঈসা (আ.) এর জন্মের দিনের কথা গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা মারিয়ামে এসেছে সেই জন্মের দিনের ওপর সালাম ও বরকতের কথা। কেন? কারণ জন্ম উদযাপনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সৃষ্টির স্বীকৃতি।
- জন্মদিন পালন করার অর্থই হলো স্বীকার করা যে তিনি একজন সৃষ্টি বা মাখলুক।
- যিনি জন্মগ্রহণ করেন তিনি কখনো স্রষ্টা বা খালেক হতে পারেন না।
- মিলাদ পালনের মাধ্যমে আমরা বারবার ঘোষণা করি যে নবীজী (সা.) আল্লাহর বান্দা এবং প্রেরিত রাসূল।
যিনি জন্ম নেন তিনি আল্লাহ হতে পারেন না। এই সাধারণ সত্যটি মিলাদ আয়োজনের মাধ্যমে আরও জোরালো হয়। এটি পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দেয় যে আমরা স্রষ্টা আর সৃষ্টির মাঝে কোনো গোলমাল করছি না। নবীজীর জন্মদিন পালন করার মানেই হলো তাঁকে আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় 'বান্দা' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।
বড় আলেমদের চোখে মিলাদ শরীফ
ইতিহাসের অনেক বড় বড় আলেম মিলাদ শরীফ আয়োজনের পক্ষে মত দিয়েছেন। মজার ব্যাপার হলো, এটি কেবল আমাদের এই অঞ্চলের প্রথা নয়। মক্কা ও মদিনার মতো পবিত্র স্থানগুলোতেও শত শত বছর ধরে মিলাদুন্নবী পালিত হয়ে আসছে। বড় আলেমদের অবস্থান ছিল এমন:
- আল্লামা ইবনে তাইমিয়া: তিনি লিখেছেন যে, মিলাদ পালনকারীদের নিয়ত যদি নবীজীর সম্মান বৃদ্ধি করা হয়, তবে তারা এর জন্য মহান পুরস্কার পাবেন।
- মাওলানা আশরাফ আলী থানভী: তিনি বলেছেন যে, প্রিয় মানুষের কথা মনে পড়লে তার জিকির বা আলোচনা করা একটি সহজাত প্রবৃত্তি। এতে দোষের কিছু নেই।
- মাওলানা খলীল আহমদ সাহারানপুরী: দেওবন্দের এই প্রখ্যাত আলেম মিলাদ শরীফের আলোচনাকে অত্যন্ত পছন্দনীয় এবং মুস্তাহাব কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মাওলানা আশরাফ আলী থানভী একটি গভীর কথা বলেছেন। তিনি মনে করতেন যে হৃদয়ে যখন ভালোবাসার টান থাকে, তখন জবান দিয়ে সেই মানুষের কথা আসবেই। এটি হৃদয়ের এক স্বাভাবিক টান।
"যে সময়ে হুজুর (সা.) এর আগমন হয়েছে, সেই সময়ের কথা মনে পড়লে অন্তরে এমনিতেই একটি টান অনুভব হয়। আর সেই টান থেকে তাঁর প্রশংসা করা তো মানুষের স্বভাবজাত বিষয়।" [আশরাফ আলী থানভী]
'বারো ওফাত' নয়, বলুন 'ঈদে মিলাদুন্নবী'
গ্রামগঞ্জের কিছু মানুষ এখনো একে ভুল করে 'বারো ওফাত' বলেন। ওফাত মানে হলো মৃত্যু বা চলে যাওয়া। মুমিনদের জন্য এটি শোকের বিষয় নয় বরং নবীজীর দুনিয়ায় আসার আনন্দই মূখ্য হওয়া উচিত। বারো তারিখের ওফাত নিয়ে ঐতিহাসিকদের মাঝে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু তাঁর আগমনের তারিখ নিয়ে আলেমদের মাঝে ঐক্যমত্য রয়েছে। ভালোবাসা যেখানে প্রবল, সেখানে চলে যাওয়ার বিয়োগ ব্যথার চেয়ে আসার আনন্দটাই বড় হয়ে ওঠে। আমরা নবীজীর আগমন উদযাপন করি বলেই এর নাম হওয়া উচিত 'ঈদে মিলাদুন্নবী'। প্রিয় মানুষের বিদায়বেলা মনে করে কষ্ট পাওয়ার চেয়ে তাঁর আসার মুহূর্তটি উদযাপন করাই তো প্রেমের ধর্ম।
আনন্দ মিছিল: সংস্কৃতির এক শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ
অনেকে র্যালী বা মিছিল করা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আসলে এগুলো হলো আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। মক্কার কাজীরাও প্রাচীনকাল থেকে মিলাদ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। মাগরিবের নামাজের পর মক্কার মানুষ একত্রিত হয়ে নবীজীর জন্মস্থান জিয়ারত করতে যেতেন।
আমরা যখন কোনো জাতীয় দিবস পালন করি তখন সাজ-সজ্জা করি। দেশের বড় জয়ে মিছিল করি। তবে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষের আগমনে কেন আমরা রাজপথে আনন্দ প্রকাশ করব না? আনন্দ প্রকাশের ধরণ দেশভেদে ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু লক্ষ্য একটাই, আর তা হলো বিশ্বনবীর প্রতি আমাদের হৃদয়ের টান প্রকাশ করা। এই কাজে শরীয়তের কোনো বাধা নেই যদি তা সঠিক পন্থায় হয়। নিজের আনন্দকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার নামই তো উৎসব।
হৃদয়ের আয়নায় ভালোবাসা
সবশেষে একটি কথা মনে রাখা জরুরি। বাইরের আলোকসজ্জা বা জাঁকজমক তখনই সার্থক হবে যখন আমাদের অন্তরে নবীজীর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা বা 'হুব্বে রাসূল' থাকবে। মিলাদুন্নবী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে তাঁর আদর্শই আমাদের জীবনের শেষ কথা। তাঁর সুমহান চরিত্র অনুসরণ করাই হলো এই দিনের আসল শিক্ষা।
আমাদের ঘরে সাধারণ কোনো মেহমান এলে আমরা কত আয়োজন করি। ঘরদোর পরিষ্কার করি, আলো জ্বালি। আমাদের মনটা খুশিতে ভরে ওঠে। তবে যিনি সারা জাহানের জন্য রহমত হয়ে এসেছেন, তাঁর আগমনে আমাদের আত্মা কতটা আলোকিত হওয়া উচিত? এই প্রশ্নটিই আজ আমরা আমাদের হৃদয়ের কাছে রেখে যাই। উত্তরটা বোধহয় আমাদের সবারই জানা।





