ইতেকাফ রামাদ্বানে এক অফুরন্ত নিয়ামত
ই'তিকাফ ঈমানী নুরে দীপ্ত হওয়ার একটি সুবর্ণ সুযোগ। কোরআন শরীফে বিভিন্নভাবে ই'তিকাফ সম্পর্কে বর্ণনা এসেছে, ইব্রাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও ইসমাইল আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কথা উল্লেখ করে ইরশাদ হয়েছে: وَعَهِدْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَن طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ #অর্থ: আমি ইব্রাহিম ও ইসমাইলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী ও রুকু সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র করো। (সুরা বাকারা: ১২৫)।

ই'তিকাফ ঈমানী নুরে দীপ্ত হওয়ার একটি সুবর্ণ সুযোগ। কোরআন শরীফে বিভিন্নভাবে ই'তিকাফ সম্পর্কে বর্ণনা এসেছে, ইব্রাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও ইসমাইল আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কথা উল্লেখ করে ইরশাদ হয়েছে:
وَعَهِدْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَن طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ
#অর্থ: আমি ইব্রাহিম ও ইসমাইলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী ও রুকু সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র করো। (সুরা বাকারা: ১২৫)।
হাদিস শরীফে ইরশাদ হচ্ছে:
عَنْ عَائِشَةَ زَوْجِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّ النَّبِيَّ كَانَ يَعْتَكِفُ الْعَشْرَ الأَوَاخِرَ مِنْ رَمَضَانَ حَتَّى تَوَفَّاهُ اللهُ ثُمَّ اعْتَكَفَ أَزْوَاجُهُ مِنْ بَعْدِهِ
#অর্থ: হযরত আয়িশাহ্ রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাদ্বানের শেষ দশকে ই‘তিকাফ করতেন। তাঁর ওফাত পর্যন্ত এই নিয়মই ছিল। এরপর তাঁর সহধর্মিণীগণও (সে দিনগুলোতে) ই‘তিকাফ করতেন। (বুখারি:২০২৬/ কিতাবুল ই'তিকাফ)।
রামাদ্বান মাসে ই'তিকাফ আল্লাহর পক্ষ থেকে মু'মীন মুসলমানদের জন্য তার নৈকট্য লাভের এক অনন্য মাধ্যম! তাই আসুন আমরা ই'তিকাফ সম্পর্কে একটু ধারণা লাভ করি।
ই'তেকাফ এর শাব্দিক অর্থ অবস্থান করা, কোন বস্তুর ওপর স্থায়ীভাবে থাকা বা কোনো স্থানে নিজেকে আবদ্ধ রাখা। শরিয়তের পরিভাষায় ইতেকাফ বলা হয়, বিশেষ স্থানে, বিশেষ শর্তে, বিশেষ সময়ে বিশেষ অবিচ্ছিন্ন ইবাদতে আত্মনিয়োগ করা। (পুরুষরা) ই'তিকাফের নিয়্যতে ঐ মসজিদে অবস্থান করবে যেখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা হয়। (মহিলারা) নিজ ঘরে নামাজের স্থানে (নামাজ পড়ার যোগ্য পবিত্র স্থান) অবস্থান করবে। বিশেষ স্থান বলতে জামে মসজিদ, বিশেষ শর্ত বলতে দুনিয়াবিমুখ অবস্থা, বিশেষ সময় বলতে রামাদ্বানের শেষ দশ দিন ।
দুনিয়ার সকল উলামাদের ইজমা (ঐক্যমত) হলো ই'তেকাফ সুন্নাত। যে সুন্নত আমলটি করছেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহারায়ে কিরাম, উম্মুল মু'মিনীন (নবীজির পুণ্যবতি স্ত্রীগণ)।
ই'তেকাফের উদ্দেশ্যে হলো রোযাদার ব্যক্তি দুনিয়ার সব ধরনের ঝামেলা থেকে নিজকে মুক্ত করে শুধুমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীনের সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে একমাত্র তার ইবাদতে আত্মনিয়োগ করা।
ই'তিকাফ তিন প্রকার
(১): সুন্নত ই'তিকাফ : রমজান মাসের শেষ ১০ দিনের ইতেকাফ সুন্নতে মোয়াক্কাদা আলাল কেফায়া। ২০ রামাদ্বান রাত থেকে (মাগরিব) ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখা পর্যন্ত এই ইতেকাফের সময়।
(২): ওয়াজিব ই'তিকাফ
মান্নতের ইতেকাফ ওয়াজিব। আল্লাহতা'লা ইরশাদ করেন:
وَلْيُوفُوا نُذُورَهُمْ
অর্থ: তারা যেন তাদের মানৎ পূর্ণ করে। (সূরা হজ: ২৯)।
(৩): নফল ইতেকাফ
উপরোক্ত দুই প্রকার ই'তিকাফ ছাড়া বাকি সব ইতেকাফ নফল। এ ইতেকাফ মানুষ যেকোনো সময় করতে পারে। অর্থাৎ কিছু সময়ের জন্য ইতেকাফের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করা। এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। যতক্ষণ চায় করতে পারে। রোজারও প্রয়োজন নেই। এমনকি যখনই মসজিদে প্রবেশ করবে নফল ইতেকাফের নিয়ত করা সুন্নত।
• নিয়্যত করা
• পুরুষের জন্য জামে মসজিদ (তবে নফল ই'তিকাফ যে কোন মসজিদেই হবে), নারীদের জন্য নিজের ঘরে সালাত (নামাজ) আদায়ের স্থানে।
• রোযা রাখা (তবে নফল ই'তিকাফের জন্য রোজা শর্ত নয়)।
• মুসলমান হওয়া।
• সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হওয়া। মাতাল লোকের ই'তিকাফ জায়েজ নেই।
• নারী পুরুষ সকলের জানাবাত বা গোসল ফরদ্ব হয় এমন অপবিত্রতা থেকে এবং নারীদের হায়িয ও নিফাস থেকে পবিত্র হওয়া।
যদি ঘরে শুরু থেকেই নামাজের স্থান নির্দিষ্ট থাকে তাহলে সেখানেই ইতেকাফ করবে। সেখান থেকে সরে অন্যত্র ইতেকাফে বসা জায়েয নেই। যদি আগে থেকে নামাজের জন্য কোনো নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারিত না থাকে তবে ইতেকাফের সময় স্থান নির্ধারিত করে নেবে এবং সেখানে ইতেকাফ করবে। ঘর ছেড়ে মসজিদে ইতেকাফ করা মহিলাদের জন্য মাকরুহ। -ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/২১১
#ইতেকাফের_ফজিলত (উপকারিতা):
عن علي بن حسين رضي الله عنه عن أبيه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم، من اعتكف عشرًا في رمضانَ كان كحجَّتَيْن وعُمرتَيْن
অর্থ: আলী বিন হোসাইন তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি রামাদ্বান মাসের শেষ দশ দিন ই'তিকাফ করবে সে দুটি ওমরাহ ও দুটি হজ্জ আদায় করার সওয়াব পাবে। (বায়হাক্বী শু'আবুল ঈমান)।
অন্য হাদিসে এসেছে;
হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, ই'তেকাফকারী নিজেকে পাপ থেকে মুক্ত রাখে এবং তাঁর জন্য পুণ্যসমূহ জারি রাখা হয়। (মিশকাত)
অন্য এক হাদিসে বর্ণিত আছে:
من اعتكف يوماً ابتغاء وجه الله باعد الله بينه وبين النار ثلاثة خنادق كل خندق كما بين الخافقين
অর্থ: যে ব্যক্তি একদিন ই'তেকাফ করে আল্লাহপাক তাঁর এবং জাহান্নামের মধ্যে তিন খন্দক দূরত্বের ব্যবধান রাখবেন। এই দূরত্ব হবে আসমান ও জমিনের দূরত্বের চেয়েও অধিক। (শু'আবুল ঈমান লিল বায়হাক্বী:৩৯৬৫)।
• অহেতুক কথা না বলা।
• উত্তম মসজিদ নির্বাচন করা।
• বেশি বেশি কোরআন শরীফ, হাদিস শরীফ পাঠ করা ।
• নফল সালাত (নামাজ) যথা তাহাজ্জুদ, আউয়্যাবিন, সালাতুত্ তাসবীহ, সালাতুল হাজাত, সালাতুত্ তাওবাহ বেশি বেশি আদায় করা; ইত্যাদি ।
• যিকর করা।
• ইলমে দ্বীন শিক্ষা দেওয়া ও শিক্ষা করা।
• দুরুধ শরীফ পাঠ করা ও সীরাতুন্নবী অধ্যায়ন করা।
• আম্বিয়া ও আউলিয়া কেরামদের জীবনী পাঠ করা ।
• শরয়ী আহকামের কিতাবাদি পাঠ করা ।
• লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করার জন্য প্রতি রাত জেগে থাকা।
• বেশি বেশি ইস্তেগফার ও দু'চোখের অশ্রু ফেলে কায়মনোবাক্যে মাওলার দরবারে দোয়া করা।
(নোট: শেষ দশকে যে ইতেকাফ করবে তার লাইলাতুল কদর নসিব হবে ইনশাআল্লাহ )।
#ইতিকাফের_জায়িয_কাজ সমূহ:
এখানে জায়িয কাজ সমূহের কয়েকটি উল্লেখ করা হলো ।
১. অন্যান্য রোজাদারের মতো রাতের বেলায় খাওয়া-দাওয়া করা।
২. একান্ত প্রয়োজনীয় দুনিয়াবি কথাবার্তা বলা বৈধ।
৩. প্রয়োজন মত বিশ্রাম এবং ঘুমানো।
৪. ই’তিকাফকারী ডাক্তার প্রয়োজনবশত বিনা পারিশ্রমিকে চিকিৎসাপত্র লিখতে পারবে।
৫. মল-মূত্র ত্যাগ, অজু, ফরদ্ব গোসল ও সুন্নত গোসলের জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়া বৈধ।
৬. ই’তিকাফকালে শরীরে তেল লাগানো, খুশবু ব্যবহার, চুল-দাড়ী আঁচড়ানোর অনুমতি আছে (তবে খেয়াল রাখতে হবে রোজার ক্ষতি যেন না হয়)।
৭. মসজিদ এক তলা হোক আর বহুতল বিশিষ্ট হোক, ছাদও মসজিদের অন্তর্ভুক্ত সুতরাং ই’তিকাফকারী ছাদে যেতে পারবে। পাশাপাশি বারান্দাও যদি মসজিদের অন্তর্ভুক্ত হয় তাহলে ই’তিকাফকারী বারান্দায়ও যেতে পারবে।
#যে_যে_কারনে ই'তিকাফ ভঙ্গ হয়:
১. যে কোনো চাকরিজীবী নিজ দায়িত্ব পালনে মসজিদের বাইরে গেলে ই’তিকাফ ভেঙে যাবে। এ ধরণের দায়িত্বশীলদেরকে ই’তিকাফের পূর্বেই ছুটি নিয়ে নিতে হবে।
২. খতম তারাবির জন্য ই’তিকাফের মসজিদ ছেড়ে অন্য মসজিদে গেলেও ই’তিকাফ ভেঙে যাবে।
৩. বিনা কারণে মসজিদের বাইরে গেলেও ই’তিকাফ ভেঙে যাবে; যদিও তা অল্প সময়ের জন্য হয়।
৪. ই’তিকাফ অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করলে; এমনকি স্ত্রীকে চুমু খাওয়া বা স্পর্শ করার দ্বারা যদি বীর্যপাত ঘটে।
৫. ফরজ ও মাসনুন নয় এমন গোসলের জন্য বের হলে ই’তিকাফ ভেঙে যাবে।
৬. কোনো কারণে রোজা ভেঙে গেলে বা রোজা রাখতে না পারলে ই’তিকাফ ভেঙে যাবে। কারণ মাসনুন ও ওয়াজিব ই’তিকফের জন্য রোজা জরুরি।
৭. শুধুমাত্র জানাজা বা রোগীকে দেগার জন্য মসজিদে থেকে বের হলে ই’তিকাফ ভেঙে যাবে।
৮: ই'তিকাফ অবস্থায় মেয়েলোকের হায়েজ শুরু হলে ই'তিকাফ ভেঙে যাবে। পরে তা যথানিয়মে কাযা করতে হবে ।
৯: মহিলারা ই'তিকাফ অবস্থায় ঘরের বাইরে বের হলে ই'তেকাফ ভেঙে যাবে।
#মাসয়ালা : সুন্নত ইতেকাফ দশ দিন। যাদের দশ দিন ইতেকাফ করার সুযোগ নেই বা সাহস হয় না তারা দুই তিন দিন নফল ইতেকাফ করতে পারেন।
সুতরাং উপরোক্ত বিষয়গুলো আমরা স্মরণে রেখে আল্লাহ ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পথ ও মতে থেকে যথাযথভাবে ই’তিকাফ আদায় করব এবং লাইলাতুল ক্বদর অর্জনের চেষ্টা করে আখিরাতের মুক্তি নিশ্চিতে সচেষ্ট হব। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমীন।
১: ফতোয়ায়ে আলমগিরী
২: ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া
৩: ফতোয়ায়ে শামী (রদ্দুল মুহতার আলা দুররিল মুহতার)
৪: ফতোয়া ও মাসাঈল দ্বিতীয় খন্ড (ইসলামী ফাউন্ডেশন)।




