মাঝে মাঝে খুব সাধারণ কিছু চিন্তা আমাদের মাথা এলোমেলো করে দেয়। ধরুন, আপনি একলা বসে আছেন। জানালার বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছে। আপনার হঠাৎ মনে হলো, প্রিয় কোনো মানুষের আগমনের সংবাদ কেন আমাদের মনকে এক নিমেষে ভালো করে দেয়? আসলে ভালোবাসা তো যুক্তির ধার ধারে না। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষ হযরত মুহাম্মদ (সা.) যখন এই পৃথিবীতে এলেন, তখন যেন অন্ধকারের বুক চিরে এক অলৌকিক জ্যোতির বন্যা বয়ে গেল। মিলাদ-উন-নাবী (সা.) নিয়ে আমাদের মনে অনেক সময় অনেক রকম জিজ্ঞাসা জাগে। এটি কি কেবলই একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতা? উৎস উপাত্তের গভীরে তাকালে আমরা দেখব, মিলাদ হলো নবীজি (সা.) এর জন্ম, সীরাত বা জীবনচরিত এবং তাঁর অনুপম গুণাবলী চর্চার এক পবিত্র উপলক্ষ।
মিলাদ আসলে কী: কেবল একটি দিন নাকি আজীবনের চর্চা?
'মিলাদ' শব্দটির আভিধানিক অর্থ বেশ চমকপ্রদ। এটি এসেছে 'বিলাদাত' শব্দ থেকে, যার সহজ অর্থ হলো জন্ম। আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী, মিলাদ বলতে জন্মের সময় বা স্থানকে বোঝানো হয়। তবে শরিয়তের ভাষায় এর অর্থ আরও গভীর। মিলাদ হলো নবী করীম (সা.) এর জন্মের সময়কার অলৌকিক ঘটনাবলী স্মরণ করা। এটি এমন এক আসর যেখানে মুমিনরা একত্রিত হয়ে নবীজির (সা.) প্রতি দরুদ ও সালামের তোহফা পাঠ করেন এবং তাঁর প্রশংসনীয় গুণগান গেয়ে অন্তরকে প্রশান্ত করেন।
এখানে একটু থেমে আমাদের একটি সূক্ষ্ম বিষয় বুঝতে হবে। মিলাদ মানে কি কেবল একটি দিন বা রাত আনন্দ করা? মোটেও তা নয়। একজন প্রকৃত মুমিনের দায়িত্ব হলো জীবনের প্রতিটি সেকেন্ডে নবীজির (সা.) সুন্নাহ স্মরণ করা। মিলাদ হলো সেই ভালোবাসারই একটি বিশেষ প্রকাশ। আমাদের আলেমদের উচিত এই দিনে উম্মতকে নবীজির (সা.) আদর্শ, তাঁর শিষ্টাচার এবং ইবাদত সম্পর্কে নতুন করে দীক্ষা দেওয়া।
কুরআনের আয়নায় নবীগণের জন্মদিন
পবিত্র কুরআনের পাতা উল্টালে আমরা দেখি, মহান আল্লাহ নিজেই নবীগণের জন্মের কথা অত্যন্ত মমতা ও গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছেন। এটি যে কেবল কোনো সাধারণ রীতি নয় বরং একটি প্রশংসনীয় কাজ, তার প্রমাণ খোদ কুরআন। হযরত ইয়াহইয়া (আ.) সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন:
"সালাম সেই দিনের ওপর যেদিন তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন, যেদিন তিনি মৃত্যুবরণ করবেন এবং যেদিন তিনি জীবিত হয়ে পুনরুত্থিত হবেন।" (সূরা মারইয়াম, আয়াত ১৫)
শুধু তাই নয়, হযরত ঈসা (আ.) নিজেও নিজের জন্মের দিনের ওপর শান্তি বর্ষণের কথা বলেছেন যা সূরা মারইয়ামের ৩৩ নম্বর আয়াতে বর্ণিত আছে। মহান আল্লাহ যেভাবে নবীদের জন্মের আগের ও পরের কাহিনী বর্ণনা করে মানুষের হৃদয়কে সত্যের পথে ডাকেন, মিলাদ পাঠের রীতিটিও ঠিক তেমনই এক আধ্যাত্মিক উদ্যোগ।
'আইয়ামুল্লাহ' বা আল্লাহর বিশেষ দিনসমূহের তাৎপর্য
সূরা ইব্রাহিমের ৫ এবং ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা হযরত মুসা (আ.) কে একটি বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন তাঁর কওমকে যেন 'আইয়ামুল্লাহ' বা আল্লাহর দিনসমূহ স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। এই 'আল্লাহর দিন' বলতে সেই বিশেষ সময়গুলোকে বোঝানো হয়েছে, যখন আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির ওপর বড় কোনো নেয়ামত বা অনুগ্রহ দান করেছেন।
একটু ভেবে দেখুন, ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার দিনটি যদি 'আল্লাহর দিন' হিসেবে স্মরণীয় হতে পারে, তবে মহানবী (সা.) এর আগমনের দিনটি কেন শ্রেষ্ঠতম দিন হবে না? তিনি তো গোটা মানবজাতিকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে মুক্তি দিয়ে হেদায়েতের পরম আলোতে নিয়ে এসেছেন। আল্লাহর কোনো বড় নেয়ামত লাভ করলে আনন্দ প্রকাশ করা আসলে কুরআনেরই নির্দেশ। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে আল্লাহ নেয়ামত বাড়িয়ে দেন, আর অকৃতজ্ঞ হলে শাস্তির কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন।
নবীজির (সা.) নিজের জন্মদিন পালনের এক অনন্য পদ্ধতি
অনেকে মনে করেন মিলাদ পালন বুঝি কোনো নতুন উদ্ভাবন বা বিদআত। তবে সহীহ মুসলিম ও মিশকাত শরীফের হাদীস আমাদের অন্য এক চমৎকার সত্যের মুখোমুখি করে। যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) কে সোমবার রোজা রাখার কারণ জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি সহজভাবে উত্তর দিলেন, "এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনে আমার ওপর কুরআন নাযিল হয়েছে।"
কী অপূর্ব এই কৃতজ্ঞতার ধরণ! নবীজি (সা.) নিজেই প্রতি সোমবার রোজা রাখার মাধ্যমে তাঁর আগমনের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন। তার মানে নিজের জন্মের দিনকে বিশেষ ইবাদতের মাধ্যমে উদযাপন করা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) এর একটি প্রিয় সুন্নাহ বা রীতি।
শত্রুর স্বস্তি: আবু লাহাবের অবাক করা ঘটনা
নবীজির (সা.) প্রতি ভালোবাসা কতটা শক্তিশালী হতে পারে, তা আবু লাহাবের একটি ঘটনা থেকে খুব সুন্দরভাবে বোঝা যায়। ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, আবু লাহাবের মৃত্যুর পর তাকে স্বপ্নে দেখা গেলে সে জানায় যে প্রতি সোমবার তার কবরের আজাব কিছুটা লাঘব করা হয়। এর কারণ কী? কারণ হলো, নবীজির (সা.) জন্মের সংবাদ শুনে খুশিতে সে তার দাসী সুয়াইবাকে আঙুলের ইশারায় মুক্ত করে দিয়েছিল। সেই আঙুল দিয়ে সে এখন পানি পান করতে পারে।
ভাবুন তো একবার, একজন ঘোর অবিশ্বাসী হওয়া সত্ত্বেও কেবল নবীজির (সা.) আগমনে মুহূর্তের জন্য খুশি হওয়ার কারণে যদি আবু লাহাবের আজাব লাঘব হতে পারে, তবে একজন মুমিনের পুরস্কার কত বিশাল হতে পারে! এটি আমাদের নবীপ্রেমের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দেয়।
বিখ্যাত ইমাম ও আলেমদের সুচিন্তিত রায়
ইতিহাসের বরেণ্য ইমাম ও আলেমগণ মিলাদ উদযাপনের বিষয়ে খুব পরিষ্কার ও ইতিবাচক রায় দিয়েছেন। ইমাম সুয়ূতী একে 'বিদআতে হাসানা' বা উত্তম উদ্ভাবন বলেছেন। 'বিদআতে হাসানা' বিষয়টি আমাদের কাছে জটিল মনে হতে পারে, কিন্তু একে যদি আমরা অন্যভাবে দেখি তবে খুব সহজ। ধরুন, এক মা তার সন্তানের জন্য প্রতিদিন নতুন নতুন উপায়ে ভালোবাসা প্রকাশ করেন। সেটা তো কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে হয় না, অথচ তা কতই না সুন্দর এবং প্রশংসনীয়। মিলাদও ঠিক তেমনই এক অকৃত্রিম ভালোবাসা।
ইমাম আল-কাসতালানী তো আরও এক ধাপ এগিয়ে চমৎকার একটি কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, মিলাদ উদযাপন হলো "অসুস্থ হৃদয়ের সর্বোত্তম নিরাময়।" এমনকি ইবনে তাইমিয়াও বলেছেন যে, নবীজির (সা.) প্রতি ভালোবাসা এবং সম্মানের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মানুষ মিলাদের মাধ্যমে যে প্রচেষ্টা চালায়, তার জন্য আল্লাহ অবশ্যই তাদের সওয়াব দেবেন। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানীর মতে, আল্লাহর বড় নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অংশ হিসেবে মিলাদ পালন করা একটি সঠিক ও শুদ্ধ কাজ।
উপসংহার
আলোচনার শেষে এসে আমাদের মনের আয়নায় কেবল একটি সত্যই ভেসে ওঠে: মিলাদ-উন-নাবী (সা.) কেবল বছরের একটি দিনের আনুষ্ঠানিক উৎসব নয়। এটি হলো নবীজির (সা.) প্রতি আমাদের আজীবনের ভালোবাসার এক মজবুত সেতুবন্ধন। কুরআন, হাদীস এবং বড় বড় ইমামদের মতামতের মধ্য দিয়ে আমরা এক নিটোল সত্যকে খুঁজে পেলাম। আর তা হলো, এই উদযাপন মূলত আল্লাহর প্রতি এক বিশাল কৃতজ্ঞতার নাম।
নবীজির (সা.) সীরাত পাঠ করা এবং তাঁর দেখানো আলোকিত পথে নিজের জীবনকে সাজানোই হলো একজন মুমিনের আসল সার্থকতা। আজ নিজেকে একটি গূঢ় প্রশ্ন করা যেতে পারে: আমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস আর প্রতিটি চিন্তা কি সেই মহান নবী (সা.) এর প্রতি ভালোবাসার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে, যাঁর জন্মের খুশিতে এক অতি বড় পাপিষ্ঠও মুক্তির ঘ্রাণ পেয়েছিল? এই একটি অনুধাবনই হয়তো বদলে দিতে পারে আমাদের বাকি জীবন।





