ইসলামের কন্ঠইসলামের কন্ঠ
সম্পাদকীয়আর্কাইভআমাদের পরিচিতিলেখা পাঠানোর নিয়মাবলীযোগাযোগের মাধ্যম
হাদীস শরীফ

পর্দা : এক অনন্য সৌন্দর্যের নাম

আমি একবার আমার এক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, "পর্দা কি নারীর বন্ধন, নাকি মুক্তি?" সে একটু চুপ করে থেকে বলেছিল, "ভাই, যে ফুলকে কাঁটা ঘিরে রাখে, সেটা কি ফুলের বন্ধন, নাকি সুরক্ষা?" উত্তরটা আমার মনে গেঁথে গিয়েছিল। ‘الْحِجَابُ’ শুধু একটি কাপড় নয় ইসলাম নারীকে যেভাবে দেখে, সেটা অনেক গভীর, অনেক অর্থবহ। حِجَاب এই শব্দটির অর্থ শুধু মাথার কাপড় নয়। এর অর্থ হলো اَلسَّتْر বা اَلسَّاتْر যা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়, যা রক্ষা করে, যা সম্মান দেয়। পর্দা নারীজাতির ভূষণ। নারীর নারীত্বের রক্ষাকবচ।

মোহাম্মদ আব্দুল আজিম
পর্দা : এক অনন্য সৌন্দর্যের নাম

আমি একবার আমার এক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, "পর্দা কি নারীর বন্ধন, নাকি মুক্তি?"

সে একটু চুপ করে থেকে বলেছিল, "ভাই, যে ফুলকে কাঁটা ঘিরে রাখে, সেটা কি ফুলের বন্ধন, নাকি সুরক্ষা?" উত্তরটা আমার মনে গেঁথে গিয়েছিল।

‘হিজাব’ শুধু একটি কাপড় নয়

ইসলাম নারীকে যেভাবে দেখে, সেটা অনেক গভীর, অনেক অর্থবহ। حِجَاب এই শব্দটির অর্থ শুধু মাথার কাপড় নয়। এর অর্থ হলো اَلسَّتْر বা اَلسَّاتْر যা যা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়, যা রক্ষা করে, যা সম্মান দেয়। পর্দা নারীজাতির ভূষণ। নারীর নারীত্বের রক্ষাকবচ।

আল্লাহর বাণী এক অলৌকিক নির্দেশনা

মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ

"মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে ও তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে। তারা যেন সাধারণ প্রকাশমান থাকে তা ব্যতীত তাদের আভরণ অলঙ্কার ও আকর্ষণীয় পোশাক প্রদর্শন না করে। তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে রাখে।" (সূরা নূর, আয়াত ৩১)

আমি যখন এই আয়াতটি পড়ি, আমার মনে হয়, এটি কোনো কঠোর আদেশ নয়। এটি একজন স্নেহময় রবের পক্ষ থেকে তাঁর প্রিয় সৃষ্টির জন্য এক অপূর্ব উপহার।

আল্লাহ আরও বলেন,

يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ

"তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দাংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়।" (সূরা আহযাব, আয়াত ৫৯)

কী সুন্দর! কী সহজ! একটি চাদর, আর তার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক অনন্ত মর্যাদা।

শরিয়তের সংজ্ঞায় কতটুকু পর্দা?

উপরিউক্ত আয়াতসমূহের আলোকে ইসলামি শরিয়ত বলে,

🔹 নারীর ক্ষেত্রে মুখমণ্ডল, দুই হাত ও দুই পায়ের পাতা ছাড়া সমগ্র শরীর ঢেকে রাখা।

🔹 পুরুষের ক্ষেত্রে নাভি থেকে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ঢেকে রাখা।

পর্দা শুধু নারীর বিষয় নয়, এটি নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা।

রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিস এক হৃদয়গ্রাহী ঘটনা

হজরত ইবনে ওমর (رضي الله عنه) বর্ণনা করেন, প্রিয়নবি (ﷺ) বলেন –

قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَن جَرَّ ثَوْبَهُ خُيَلَاءَ لَمْ يَنْظُرِ اللهُ إِلَيْهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، فَقَالَتْ أُمُّ سَلَمَةَ: فَكَيْفَ يَصْنَعُ النِّسَاءُ بِذُيُولِهِنَّ؟ قَالَ: يُرْخِينَ شِبْرًا، فَقَالَتْ: إِذَا تَنْكَشِفُ أَقْدَامُهُنَّ، قَالَ: فَيُرْخِينَهُ ذِرَاعًا، لَا يَزِدْنَ عَلَيْهِ

অর্থ : রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,

"যে ব্যক্তি অহংকারের সাথে তার কাপড় গোড়ালির নিচে ঝুলিয়ে পরিধান করবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার দিকে তাকাবেন না।"
তখন উমে সালমা (রাযি.) জিজ্ঞেস করলেন, "তাহলে মেয়েরা তাদের আঁচলের কী করবে?"

নবিজি বললেন, "এক বিঘত নিচে নামিয়ে দেবে।"

উমে সালমা আবার বললেন, "তাহলে তো পা অনাবৃত হয়ে পড়বে!"

নবিজি বললেন, "তাহলে একহাত নিচে ঝুলিয়ে পরবে, এর বেশি নয়।" (জামে তিরমিযি ও সুনানু নাসায়ী)

এই ঘটনাটি পড়লে আমার মনে হয়, ইসলাম কতটা বাস্তববাদী! একজন নারী প্রশ্ন করছেন, আর নবিজি ধৈর্য ধরে উত্তর দিচ্ছেন। এখানে কোনো কঠোরতা নেই, আছে মায়া, আছে বোঝাপড়া।

মহিলার শরীর পর্দায় আবৃত করার সাথে সাথে তার পরিধেয় বস্ত্রও আবৃত রাখা, এটা পর্দার সর্বোচ্চ স্তর। শরিয়ত সমর্থিত প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে তাদেরকে বের না হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঘরে থাকার নির্দেশ অবমাননা নয়, সম্মান

অনেকে মনে করেন, ইসলাম নারীকে ঘরে বন্দী করে রাখে। কিন্তু মহান আল্লাহ বলেন,

وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى

"এবং তোমরা স্বগৃহে অবস্থান করবে। প্রাচীন জাহেলিযুগের মতো নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়িও না।" (সূরা আহযাব, আয়াত ৩৩)

আজকের আধুনিক পৃথিবীতে নারী যেভাবে পণ্যের মতো উপস্থাপিত হচ্ছে, বিজ্ঞাপনে, সিনেমায়, সোশ্যাল মিডিয়ায়, সেটা কি সত্যিকারের মুক্তি? নাকি এটাই সেই পুরনো জাহেলিয়াত, নতুন মোড়কে?

ইসলাম নারীকে বলছে, "তুমি প্রদর্শনের বস্তু নও। তুমি সম্মানের পাত্র।"

একটি ছোট্ট গল্প

আমি কোন একজনকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম,

"পর্দা করা কেমন লাগে?"

সে হেসে বলেছিল, "যেন নিজের জন্য একটা নিরাপদ পৃথিবী বানিয়ে নিলাম। বাইরের কোলাহল আর আমাকে স্পর্শ করতে পারে না।"

এই উত্তরটাই হয়তো পর্দার সবচেয়ে সহজ সংজ্ঞা।

শেষ কথা

পর্দা কোনো অন্ধকার নয়। পর্দা হলো আলো, যে আলো নারীর অন্তরের সৌন্দর্যকে রক্ষা করে, তার ব্যক্তিত্বকে উজ্জ্বল করে, তার মর্যাদাকে সমুন্নত রাখে।

অন্ধ সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মকতুম (রাযি.) যখন নবিজির (ﷺ) হুজরায় এলেন, তখনও নবিজি উমে সালমা ও মায়মুনা (রাযি.)-কে পর্দা করার নির্দেশ দিলেন। একজন অন্ধ মানুষের সামনেও পর্দা, এটাই ইসলামের শিক্ষা। এটা বাহ্যিক দৃষ্টির জন্য নয়, এটা নারীর আত্মিক মর্যাদার জন্য।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে পর্দার প্রকৃত সৌন্দর্য অনুধাবন করার তওফিক দিন। আমিন।

"পর্দা নারীর দুর্বলতা নয়, এটি তার শক্তির প্রতীক।"