রামাদ্বান : ইফত্বারের আনন্দ
রামাদ্বান মাস হচ্ছে মুমিন মুসলমানের জন্য একটি আনন্দময় মাস। এ মাস আসলে সবার মনে একটা আনন্দের জোয়ার দেখা দেয়। বিশেষ করে রোজা পালন করা সহ বিভিন্ন ইবাদত করার ক্ষেত্রে। আর তার মধ্যে অন্যতম একটি ইবাদত ও আনন্দ উপভোগ করার সময় হচ্ছে বান্দা যখন দিন শেষে ইফত্বার করে। আজ আমরা কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সে বিষয়ে খুব সংক্ষেপে জানার চেষ্টা করব ইনশা আল্লাহ।

রামাদ্বান মাস হচ্ছে মুমিন মুসলমানের জন্য একটি আনন্দময় মাস। এ মাস আসলে সবার মনে একটা আনন্দের জোয়ার দেখা দেয়। বিশেষ করে রোজা পালন করা সহ বিভিন্ন ইবাদত করার ক্ষেত্রে। আর তার মধ্যে অন্যতম একটি ইবাদত ও আনন্দ উপভোগ করার সময় হচ্ছে বান্দা যখন দিন শেষে ইফত্বার করে। আজ আমরা কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সে বিষয়ে খুব সংক্ষেপে জানার চেষ্টা করব ইনশা আল্লাহ।
----ইফত্বার কি
ইফত্বার হচ্ছে আরবি শব্দ। যার অর্থ হচ্ছে ভঙ্গ করা। একজন রোজাদার সুবহে সাদিক থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সব ধরনের খানাপিনা থেকে বিরত থাকার পর হালাল কিছু আহার করে রোজা থেকে বিরতি গ্রহন করেন। আর তাকেই বলা হয় ইফত্বার।
---ইফত্বারের আনন্দ
একজন রোজাদারের জন্য সারাদিন শেষে ইফত্বারের সময় যখন আসে তখন সত্যিই এটি তাঁর কাছে সবচেয়ে বেশি আনন্দের মূহুর্তে পরিনত হয়। আর এই আনন্দ সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকেই প্রাপ্ত একটা পুরস্কার।
মুসলিম শরীফের হাদিসে এসেছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضى الله عنه قَالَ - قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ فَرْحَةٌ عِنْدَ فِطْرِهِ وَفَرْحَةٌ عِنْدَ لِقَاءِ رَبِّهِ.
"হযরত আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- রোজা পালনকারীর জন্য দুটি আনন্দ আছে। একটি তার ইফত্বারের সময় এবং অপরটি তার প্রতিপালক আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের সময়"।
----ইফত্বারের সময় কখন
ইফত্বারের সময় হচ্ছে দিনের শেষ বেলায় এবং রাতের শুরুতে। তথা যখন মাগরিবের সময় হবে। কুরআনুল কারীমের সূরা বাকারার ১৮৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
ثُمَّ اَتِمُّوا الصِّیَامَ اِلَی الَّیۡلِ.
"তোমরা রোজাকে রাত পর্যন্ত পূর্ণ কর"।
মুসলিম শরীফের হাদিসে এসেছে-
عَنْ عُمَرَ رضى الله عنه قَالَ - قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا أَقْبَلَ اللَّيْلُ وَأَدْبَرَ النَّهَارُ - وَغَابَتِ الشَّمْسُ فَقَدْ أَفْطَرَ الصَّائِمُ.
"হযরত উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- যখন রাত আসে, দিন চলে যায় এবং সূর্য অদৃশ্য হয়ে যায়, তখন সিয়াম পালনকারী ইফত্বার করবে"।
----ইফত্বারে বিলম্ব না করা
কোন ভাবেই বিলম্ব না করে ইফত্বারের সময় হওয়ার সাথে সাথে ইফত্বার করা হচ্ছে উত্তম।
বুখারী ও মুসলিম শরীফের হাদিসে এসেছে-
عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ رضى الله عنهما قال - قال رسول الله (ﷺ) لاَ يَزَالُ النَّاسُ بِخَيْرٍ مَا عَجَّلُوا الْفِطْرَ.
"হযরত সাহল ইবনে সাদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন- যতদিন মানুষ বিলম্ব না করে ইফত্বার করবে, ততদিন তারা কল্যাণের উপর থাকবে"।
সহীহ বুখারী শরীফের হাদিসে এসেছে-
عَنْ ابْنِ أَبِي أَوْفَى قَالَ كُنْتُ مَعَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فِي سَفَرٍ فَصَامَ حَتَّى أَمْسَى قَالَ لِرَجُلٍ انْزِلْ فَاجْدَحْ لِي قَالَ لَوْ انْتَظَرْتَ حَتَّى تُمْسِيَ قَالَ انْزِلْ فَاجْدَحْ لِي إِذَا رَأَيْتَ اللَّيْلَ قَدْ أَقْبَلَ مِنْ هَا هُنَا فَقَدْ أَفْطَرَ الصَّائِمُ.
"হযরত ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক সফরে আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি সন্ধ্যা পর্যন্ত সওম পালন করেন। এরপর এক ব্যক্তিকে বললেন, সাওয়ারী হতে নেমে ছাতু গুলে আন। লোকটি বলল, আপনি যদি (পূর্ণ সন্ধ্যা হওয়া পর্যন্ত) অপেক্ষা করতেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুনরায় বললেন, নেমে আমার জন্য ছাতু গুলে আন। তারপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যখন তুমি এদিক (পূর্বদিক) হতে রাত্রির আগমন দেখতে পাবে তখন রোজা পালনকারী ইফত্বার করবে"।
----ইফত্বারের সময় দোয়া
ইফত্বারের সময় দোয়া করা উত্তম। এ সময়টা রোজাদারের জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বড় এক নেয়ামত। এ সময়ে রোজা পালনকারীর দোয়া কবুল হয়। কারণ ইফত্বারের সময়টা হল বিনয় ও আল্লাহর জন্য ধৈর্য ধারণের মুহূর্ত। দুনিয়ার সমস্ত উপলক্ষ ছেড়ে মানুষ তখন কেবলই আল্লাহর জন্য অপেক্ষা করে। অপেক্ষা করে তার রহমতের ও কবুলিয়তের।
তিরমিজী ও মূসনাদে আহমাদে এসেছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضى الله قَالَ - قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ثلاثة لا تُرَدُّ دَعْوَتُهُمْ - الإِمَامُ الْعَادِلُ - وَالصَّائِمُ حِينَ يُفْطِرُ - وَدَعْوَةُ الْمَظْلُومِ.
"হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তিন ব্যক্তির দোয়া কবুল না করে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। তারা হলেন ন্যায়বিচারক শাসনকর্তা, ইফত্বারের আগে রোজাদারের দোয়া এবং মাজলুমের দোয়া"।
---ইফত্বারের দোয়া
রোজা থেকে বিরতি গ্রহণ করার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাঠ করতেন। দোয়াটি আবু দাউদ শরীফের হাদিসে এসেছে-
عَنْ مُعَاذِ بْنِ زُهْرَةَ رضى الله عنه قال - أَنَّهُ بَلَغَهُ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم كَانَ إِذَا أَفْطَرَ قَالَ - اللَّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَعَلَى رِزْقِكَ أَفْطَرْتُ.
"হযরত মুয়ায ইবনে যুহরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তাঁর নিকট হাদীস পৌঁছেছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইফত্বারের সময় বলতেন- আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া আলা রিযক্বিক্বা আফতারতু। অর্থঃ হে আল্লাহ! আমি আপনার উদ্দেশ্যেই রোজা পালন করেছি এবং আপনার দেয়া রিযিক দ্বারাই ইফত্বার করেছি"।
আর ইফত্বার শেষ করে বলতেন-
ذَهَبَ الظَّمَأُ وَابْتَلَّتِ الْعُرُوقُ وَثَبَتَ الأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ.
"পিপাসা দূরীভূত হয়েছে, শিরা-উপশিরাগুলো সিক্ত হয়েছে এবং ইনশা আল্লাহ প্রতিদানও নির্ধারিত হয়েছে"।
----মোয়াজ্জীনের ইফত্বার
মোয়াজ্জীন সাহেবের দায়িত্ব হলো যখন আযানের সময় হবে তখন আযান দেওয়া। আবার এদিকে একজন রোজাদার হিসেবে ইফত্বার বিলম্ব না করা। এমতাবস্থায় তিনি কি করবেন? ফুকাহায়ে কেরামদের মত অনুযায়ী তখন তিনি খেজুর বা পানি দিয়ে রোজা থেকে বিরতি গ্রহন করে আযান দিবেন। অথবা কিছু না খেয়েও তিনি আযান দিতে পারেন। তবে এমনটি যেন না হয় একবারে পেটপুরে খেয়ে আযান দিলেন অথবা আযান শেষে আরো বিলম্ব করে ইফত্বার করলেন।
----কি দিয়ে ইফত্বার করবেন
খেজুর দিয়ে ইফত্বার করা হচ্ছে মুস্তাহাব। খেজুর না থাকলে মিষ্টি জাতীয় কিছু দিয়েও করা যাবে। আর যদি এরকম কিছু না থাকে তাহলে শরবত, পানি বা হালাল যে কোন খাবার দিয়ে ইফত্বার করে নিতে কোন সমস্যা নেই।
তিরমিজি ও আবু দাউদ শরীফের হাদিসে এসেছে -
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رضى الله عنهما قال - كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يُفْطِرُ قَبْلَ أَنْ يُصَلِّيَ عَلَى رُطَبَاتٍ - فَإِنْ لَمْ تَكُنْ رُطَبَاتٌ فَتُمَيْرَاتٍ - فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تُمَيْرَاتٌ حَسَا حَسَوَاتٍ مِنْ مَاءٍ.
"হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (মাগরিবের) নামায আদায়ের পূর্বেই কয়েকটা তাজা খেজুর দ্বারা ইফত্বার করতেন। তিনি তাজা খেজুর না পেলে কয়েকটা শুকনো খেজুর দ্বারা ইফত্বার করতেন আর শুকনো খেজুরও না পেলে তবে কয়েক ঢোক পানি পান করতেন"।
----রোজাদারকে ইফত্বার করানো
রামাদ্বান মাসে রোজাদারকে ইফত্বার করানো অনেক সাওয়াবের কাজ।
তিরমিজী ও ইবনে মাজাহ এর হাদিসে এসেছে-
عَن زَيدِ بنِ خَالِدٍ الجُهَنِيِّ رضي الله عنه قال - قال رسول الله صلى الله عليه وسلم مَنْ فَطَّرَ صَائِماً - كَانَ لَهُ مِثْلُ أَجْرِهِ - غَيْرَ أنَّهُ لاَ يُنْقَصُ مِنْ أَجْرِ الصَّائِمِ شَيْءٌ.
"হযরত যায়েদ ইবনে খালেদ জুহানী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন - যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে ইফত্বার করাবে, সে রোজাদারের সমান নেকীর অধিকারী হবে। আর তাতে রোজাদারের নেকীর কিছুই কমবে না"।
---- ইফতারের নামে অপচয় করা
আমাদের সমাজে একটা কুধারনা হলো রামাদ্বান মাসে যা পার তা খাও, কোন হিসাব নাই! এই কথার উপর ভিত্তি করে মানুষ ইফত্বারের সময় অনেক কিছু তৈরি করেন এবং অপচয় করেন। মূলত একজন মানুষ কতটুকু খাবে বা পান করবে সেটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস থেকেই পাওয়া যায়।
তিরমিজী ও ইবনে মাজাহ এর হাদিসে এসেছে-
عَنْ المِقْدَامِ بْنِ مَعْدِي كَرِبَ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ـ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ـ يَقُولُ: مَا مَلأ آدَمِيٌّ وِعَاءً شَرٌّا مِن بَطْنٍ، بِحَسْبِ ابْنِ آدَمَ أُكُلاتٌ يُقِمْنَ صُلْبَهُ فَإِنْ كَانَ لا مَحَالَةَ فَثُلُثٌ لِطَعَامِهِ وَثُلُثٌ لِشَرَابِهِ وَثُلُثٌ لِنَفَسِهِ.
"হযরত মিকদাম ইবনু মাদীকারিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি, মানুষ পেট হতে অধিক নিকৃষ্ট কোন পাত্র পূর্ণ করে না। মেরুদন্ড সোজা রাখতে পারে এমন কয়েক গ্রাস খাবারই আদম সন্তানের জন্য যথেষ্ট। তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন হলে পাকস্থলীর এক-তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং এক তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখবে"।
মুসলিম শরীফের হাদিসে এসেছে-
عَن جَابِرٍ رضى الله عنه قَالَ - قال رسول الله صلى الله عليه وسلم طَعَامُ الوَاحِدِ يَكْفِي الاِثْنَيْنِ - وَطَعَامُ الاِثْنَيْنِ يَكْفِي الأَرْبَعَةَ - وَطَعَامُ الأَرْبَعَةِ يَكْفِي الثَّمَانِيَ.
"হযরত জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- একজনের খাবার দুজনের জন্য যথেষ্ট এবং দুজনের খাবার চারজনের জন্য যথেষ্ট, আর চারজনের খাবার আটজনের জন্য যথেষ্ট"।
অপচয় ও অপব্যয় একটি খারাপ অভ্যাস ও নিন্দনীয় কাজ। অপচয়ের সঙ্গে রয়েছে অহংকারের সম্পর্ক। নিজের বাহাদুরি প্রকাশের মনোভাব। অন্যদিকে অপব্যয়ের সঙ্গে রয়েছে শরিয়তের বিধান লঙ্ঘনের সম্পর্ক। অপচয় ও অপব্যয় মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে অবক্ষয় ডেকে আনে। যে কারণে ইসলামে অপচয় ও অপব্যয় দুটিই নিষিদ্ধ। ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী কোনো কাজ বৈধ হলেও সে ক্ষেত্রেও যদি প্রয়োজনাতিরিক্ত ব্যয় করা হয় তবে তাকে ইসরাফ বা অপচয় হিসেবে দেখা হয়। ইসলাম বৈধ কাজেও মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় সমর্থন করে না। অবৈধ কাজে ব্যয় করাকে অপব্যয় বলা হয়। অপচয় করা শয়তানের কাজে। যেমন মহান আল্লাহ পবিত্র কালামের সূরা বনী ইসরাঈলের ২৬ ও ২৭ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেছেন-
وَءَاتِ ذَا الْقُرْبٰى حَقَّهُۥ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا - إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوٓا إِخْوٰنَ الشَّيٰطِينِ ۖ وَكَانَ الشَّيْطٰنُ لِرَبِّهِۦ كَفُورًا.
"নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ।আর আত্মীয়কে তার হক দিয়ে দাও এবং মিসকীন ও মুসাফিরকেও। আর কোনভাবেই অপব্যয় করো না"।
মহান আল্লাহ বলেন হে আমার বান্দারা তোমরা
খাও, পান কর ও অপচয় করো না। যেমন এ সম্পর্কে সূরা আরাফের ৩১ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে-
يٰبَنِىٓ ءَادَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوٓا ۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ.
"হে বনী আদম, তোমরা প্রতি সালাতে তোমাদের বেশ-ভূষা গ্রহণ কর এবং খাও, পান কর ও অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না"।
ইসলামে অপচয়-অপব্যয়ের পাশাপাশি কৃপণতারও বিরোধিতা করা হয়েছে। ব্যয়ের ক্ষেত্রে ইসলামে মধ্যপন্থা অনুসরণকে উৎসাহিত করা হয়েছে।
মধ্যবর্তী অবস্থানে থেকে সবগুলো কাজ করা মুমিনের অন্যতম একটি গুণ। যেমন পবিত্র কালামে সূরা ফুরকানের ৬৭ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে-
وَالَّذِينَ إِذَآ أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذٰلِكَ قَوَامًا.
"আর তারা যখন ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না। বরং মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে"।
----ইফত্বারের নামে যুলুম
আমাদের সমাজে আরেকটি কুপ্রথা আছে মেয়ের বাড়ি থেকে ইফত্বারী আসা। এখন সে গরিব হলেও দিতে হবে। শ্বশুরবাড়ীর ইফত্বারীকে সামাজিক বন্ধন মনে করি। অথচ তা মোটেই বন্ধন হতে পারে না, বরং একটা মানুষের প্রতি যুলুম, অন্যায় ও অভিচার করা হয়। আর যারা যুলুম করেন তাদের পরিণতি সম্পর্কে কুরআন হাদিসে খুব সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে।
সূরা শুরা এর ৪২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
اِنَّمَا السَّبِیۡلُ عَلَی الَّذِیۡنَ یَظۡلِمُوۡنَ النَّاسَ وَ یَبۡغُوۡنَ فِی الۡاَرۡضِ بِغَیۡرِ الۡحَقِّ ؕ اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ.
"কেবল তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, যারা মানুষের উপর যুলম করে এবং যমীনে অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন করে বেড়ায়। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব"।
সূরা আল-ইমরানের ১৪০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
وَاللّٰہُ لَا یُحِبُّ الظّٰلِمِیۡنَ.
"আর আল্লাহ যালিমদেরকে ভালবাসেন না"।
মুসলিম শরীফের হাদিসে এসেছে-
عَنْ عِيَاضِ بنِ حِمَارٍ رضي الله عنه قَالَ - قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم صلى الله عليه وسلم إِنَّ اللهَ تَعَالَى أَوْحَى إِلَيَّ أَنْ تَوَاضَعُوا حَتَّى لاَ يَبْغِيَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ، وَلاَ يَفْخَرَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ.
হযরত ইয়ায ইবনে হিমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- মহান আল্লাহ আমাকে প্রত্যাদেশ করেছেন যে, তোমরা পরস্পরের প্রতি নম্রতা ও বিনয় ভাব প্রদর্শন কর। যাতে কেউ যেন অন্যের প্রতি অত্যাচার না করতে পারে এবং কেউ কারো সামনে গর্ব প্রকাশ না করে"।
বায়হাকী শরীফের হাদিসে এসেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
أَلَا لَا تَظْلِمُوا ، أَلَا لَا تَظْلِمُوا ، أَلَا لَا تَظْلِمُوا ، إِنَّهُ لَا يَحِلُّ مَالُ امْرِئٍ إِلَّا بِطِيبِ نَفْسٍ مِنْهُ.
"সাবধান! তোমরা যুলুম কর না, সাবধান! তোমরা যুলুম কর না, সাবধান! তোমরা যুলুম কর না। সন্তুষ্ট মনে ইজাযত দান ব্যতীত কারো মাল কারো জন্য হালাল হবে না"।
এরকম কুরআন-হাদিসে অনেক সতর্ক বাণী এসেছে কারো উপরে অত্যাচার করার ক্ষেত্রে। এবং নম্রতা ও বিনয় ভাব প্রদর্শন করার উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
সুতরাং শশুর বাড়ির ইফত্বারী, আম-কাঠাল ও ঝুল ভাত সহ যত ধরনের কুপ্রথা আছে এগুলো থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সমাজের গরিব মানুষের প্রতি কোন ধরনের যুলুম অন্যায় অবিচার করা যাবে না।
তবে কারো যদি সামর্থ থাকে এবং ইচ্ছা করে মেহমানদারী করেন তাহলে এটা সুন্নাহ হবে। এবং এজন্য সাওয়াব পাওয়া যাবে। এটা উভয়ের পক্ষ থেকে হতে পারে। যেমন শশুর বাড়ি থেকে বা আত্মীয় স্বজনের বাড়ি থেকে আপনাকে দাওয়াত করা হলে বা কোন হাদিয়া প্রদান করা হলে আপনি নিজেও সামর্থ অনুযায়ী ফিরত করার চেষ্টা করবেন। মূলত এসব হচ্ছে তাকওয়া তথা পরহেজগারী বা একজন অপরজনের প্রতি মুহাব্বাত প্রকাশের মাধ্যমে।
আল্লাহ তায়ালা রামাদ্বান মাসের উছিলায় আমারদের সবাইকে পরহেজগারী হাসিল করার তৌফিক দান করুন। রামাদ্বানের রোজাগুলো সঠিক ভাবে আদায় করার তৌফিক দান করুন। রামাদ্বানের রাহমাত বারাকাত সহ যা কল্যাণ আছে সবটুকু আমাদের দান করুন। (আমিন)




